33
Sharesবিশ্ব উদ্বাস্তু দিবসের আগের রাতেই আমার মনে পড়ে একটি নদীর নাম। করাঙ্গী। সিলেটের এক প্রত্যন্ত গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি নদী। বাংলাদেশের মানচিত্রে তাকে কি খুঁজে পাওয়া যায়? হয়তো যায়, কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রে নয়। যেমন পৃথিবীর বড় বড় ডেটা বেইসে ধরা পড়ে না সে নদীর পাড়ের কিশোরদের হাসি, বিকেলের ক্রিকেট, কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প।
করাঙ্গী ধারের সেই মাঠে প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো দুই বন্ধুর। ধরা যাক তাদের নাম রাহাত আর সিয়াম। স্কুল শেষে তারা নদীর পাড়ে বসে গল্প করত। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট, কখনও বা ভবিষ্যৎ। বড় হয়ে একজন সরকারি চাকরি করবে, আরেকজন শিক্ষক হবে। মাসে অন্তত একবার গ্রামে ফিরবে। নদীর পাড়ে বসে চা খাবে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে গল্প করবে।
স্বপ্নগুলো খুব বড় ছিল না। কিন্তু এই দেশের লাখো তরুণের মতো তাদের কাছেও সেগুলোই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। একজন পড়ল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, আরেকজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডিগ্রি শেষ হলো। বছর গেল। তারপর আরও বছর। চাকরি এল না। বিসিএসের প্রস্তুতি, নিয়োগ পরীক্ষার ফরম, কোচিং সেন্টারের নোট, আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, প্রতিবেশীর কটাক্ষ, পরিবারের উদ্বেগ।
অবশেষে একদিন তারা আরেকটি পথের কথা শুনল। আলবেনিয়া। সেখান থেকে স্পিডবোটে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে স্পেন। তারপর ইউরোপ। দালালরা বলেছিল, জীবন বদলে যাবে। বিমানবন্দরে বিদায়ের দিন তারা কেউ কাঁদেনি। কারণ তারা ভেবেছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু পৃথিবীর অনেক যাত্রার মতো এই যাত্রাও ছিল একমুখী।
আলবেনিয়া থেকে দীর্ঘ পথ। সীমান্ত। বন। পাহাড়। লুকিয়ে থাকা। পালিয়ে যাওয়া। আবার ধরা পড়া। তারপর ভূমধ্যসাগরের অন্ধকার জলরাশি। শেষ পর্যন্ত স্পেন। সেখানে পৌঁছে তারা আটক হলো। পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মুক্তিও পেল। তারপর পথ দুদিকে ভাগ হয়ে গেল। রাহাত থেকে গেল স্পেনে। সিয়াম চলে গেল পর্তুগালে।
এখনও তাদের যোগাযোগ আছে। কিন্তু আগের মতো নয়। সপ্তাহে একবার। কখনও পনেরো দিনে। কখনও মাসে একবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে করাঙ্গি নদী। ভেসে ওঠে গ্রামের মাঠ। ভেসে ওঠে কৈশোরের বিকেল। তারা গল্প করে, মনে আছে? মনে আছে নদীর পাড়ের সেই আমগাছটা? মনে আছে ঈদের সকালে খেলা? মনে আছে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন? বছরের পর বছর কেটে যায়। তাদের কেউ আর স্থায়ীভাবে বাড়ি ফিরতে পারে না।
অনেক সময় উদ্বাস্তু শব্দটি আমরা যুদ্ধ, বোমা কিংবা গৃহযুদ্ধের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু বাংলাদেশের গল্পটি ভিন্ন।
বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র নয়। গত তিন দশকে এখান থেকে গণ-বাস্তুচ্যুতি ঘটেনি। তবু হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। কেউ রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগে, কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কায়, আবার অনেকেই উন্নত জীবনের সন্ধানে। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বড় অংশই বাংলাদেশিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে রাজনৈতিক শরণার্থীর চেয়ে অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয়বিষয়ক সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডেটাবেইসের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ থেকে ১৫ হাজার বাংলাদেশি শরণার্থীর আইনি স্বীকৃতি নিয়ে বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। সংখ্যাটি খুব বড় নয়। কিন্তু আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বড়। শুধু ২০২৪ সালেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬৯ হাজার ৩৫৫ জন বাংলাদেশি নতুন করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। একই বছরে তাদের প্রায় ৯৩ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো আসলে কী বলে? এগুলো বলে, একুশ শতকের বাংলাদেশি অভিবাসনের একটি বড় অংশ কেবল শ্রমবাজারের গল্প নয়। এটি আশার গল্প। হতাশার গল্প। অপেক্ষার গল্প। এবং অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি হারানোর গল্প।
বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইতালি। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরেই ৩৩ হাজার ৪১৫ জন বাংলাদেশি ইতালিতে প্রথমবারের মতো আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। ইউরোপে বাংলাদেশিদের মোট আশ্রয় আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ইতালিতে জমা পড়ে। কিন্তু স্বীকৃতির হার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
ফ্রান্স বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য। বছরে প্রায় ৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেখানে আশ্রয় চান। স্বীকৃতির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের আবেদন তুলনামূলকভাবে বেশি সফল। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দেশটিতে ৭ হাজার ২২৫টি নতুন আবেদন জমা পড়ে এবং স্বীকৃতির হার ছিল প্রায় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।
গ্রিসে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসন বৃদ্ধির ফলে আবেদনও বেড়েছে। তবে সেখানেও অধিকাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশিদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ২০২৪ সালে কানাডায় ১৫ হাজার ৭৩৬ জন বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে করেছেন ১ হাজার ৮৩৯ জন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয় সংস্থা EUAA-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন ইউরোপে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। মার্চ ২০২৪-এ এক মাসেই প্রায় ৪ হাজার ৩০০ আবেদন জমা পড়ে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেও ইতালি বাংলাদেশিদের প্রধান গন্তব্য ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশিদের স্বীকৃতির হার ছিল ৩ শতাংশেরও নিচে।
EUAA-এর ২০২৫ সালের আশ্রয় প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের প্রায় ৪৩ হাজার আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে একটি। অথচ ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বিশাল অংশ শরণার্থী নন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে চার লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশি বৈধ রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে বসবাস করেন। তাঁদের অধিকাংশই কাজ, শিক্ষা কিংবা পরিবার পুনর্মিলনের ভিত্তিতে সেখানে আছেন। শরণার্থী বা মানবিক সুরক্ষা পাওয়া মানুষের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। কেন এত মানুষ আবেদন করছেন? সম্ভবত উত্তরটি কেবল রাজনীতিতে নয়। উত্তরটি অর্থনীতিতেও। উত্তরটি সমাজেও। উত্তরটি স্বপ্নেও।
বাংলাদেশের আরেকটি উদ্বাস্তু সংকট আন্তর্জাতিক সীমান্তের বাইরে নয়, দেশের ভেতরে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, উপকূল ভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে আসছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা কক্সবাজারে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বহু বছর ধরেই এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। এরা আন্তর্জাতিক আইনে শরণার্থী নন, কিন্তু বাস্তবে তারা ভিটেমাটি হারানো মানুষ।
কিন্তু উদ্বাস্তু কে? আর কে নয়?
সুনামগঞ্জের হাওর থেকে উঠে আসা যে ছেলেটি ঢাকার একটি মেসে বসে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে কি উদ্বাস্তু নয়? ভোলার ভাঙনকবলিত চর থেকে যে পরিবারটি এসে চট্টগ্রামের বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে, তারা কি উদ্বাস্তু নয়? কুড়িগ্রামের যে তরুণ ঢাকায় রাইড শেয়ার চালায়, কারণ গ্রামে আর কোনো কাজ নেই, সে কি উদ্বাস্তু নয়? পটুয়াখালীর যে মেয়েটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে আর কখনও স্থায়ীভাবে বাড়ি ফিরবে না বলে জানে, সে কি উদ্বাস্তু নয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রটি চাকরি পেয়েছে রাজধানীতেই, যে বুঝে গেছে বৃদ্ধ মা-বাবার বাড়িটা একদিন তালাবদ্ধ হয়ে যাবে, কারণ আর কেউ ফিরবে না, সে কি উদ্বাস্তু নয়?
মাস্টার্স শেষ করে যে ছেলেটা লন্ডনে আইএলআর পাওয়ার প্রহর গুনছে, সে কি উদ্বাস্তু নয়? কানাডারা ওন্টারিও বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, শিকোগো কিংবা লস এঞ্জেলসে যে মেয়েটা স্থায়ী হওয়ার প্রহর গুণছে, সে কি উদ্বাস্তু নয়?
এই শতাব্দী ঘর হারানো মানুষের শতাব্দী। কেউ দেশ হারায়। কেউ শহর হারায়। কেউ নদী হারায়। কেউ কেবল হারায় ফেরার পথ।
রাহাত আর সিয়ামের মতো অসংখ্য মানুষ আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুমাতে যায়। তাদের নাগরিকত্ব আছে। কাজ আছে। হয়তো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিপূর্ণ আছে। কিন্তু তাদের ভেতরে এখনও বয়ে চলে করাঙ্গী নদী।
রাতের কোনো এক প্রহরে হয়তো তারা মোবাইলের পর্দায় পুরোনো ছবি খুলে বসে। দেখে মাঠ। দেখে কুয়াশা। দেখে বাড়ি। মানুষ শেষ পর্যন্ত কোথায় বাস করে? যে দেশে সে থাকে সেখানে? নাকি যে দেশকে সে মনে রাখে সেখানে?
হয়তো এ কারণেই স্মৃতি এত বিপজ্জনক। স্মৃতি মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় হারানো নদীর কাছে। হারানো মাঠের কাছে। হারানো মানুষের কাছে। ক্ষমতা মানুষকে স্থানচ্যুত করতে পারে, সীমান্ত টানতে পারে, পাসপোর্ট বদলে দিতে পারে, ঠিকানা বদলে দিতে পারে। কিন্তু স্মৃতির ভেতর যে বাড়ি তৈরি হয়, তাকে উচ্ছেদ করার ক্ষমতা কারও নেই। সেই কারণেই একুশ শতকে স্মৃতিই বিদ্রোহ।
আর বাড়ি ফেরার স্বপ্ন? বছরের পর বছর, মহাদেশের পর মহাদেশ পেরিয়ে, মানুষের বুকের ভেতর যে স্বপ্ন বেঁচে থাকে, তার নামই বিপ্লব। স্মৃতিই একুশ শতকের বিদ্রোহ, আর বাড়ি ফেরাই বিপ্লব।
-------