এক্সক্লুসিভ



নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন / ১৮ / ২০২৬


রবিন হুডের ‘আস্তানা’— সেই ওক গাছটি মারা গেছে


19

Shares


প্রাচীনকালের নাইটরা জানতেন কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে গরিবের বন্ধু রবিন হুডকে। সে অনুসারে তারা হাজির হতেন নির্দিষ্ট একটি গাছের কাছে। জানা কথা যে সেই গাছটির অবস্থান শেরউড জঙ্গলে। কিংবদন্তির এ দস্যুর সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইংল্যান্ডের বনভূমিটির নাম জড়িয়ে আছে। আর বিশেষভাবে একটি গাছকে তার আস্তানা হিসেবে উল্লেখ করা হতো— মেজর ওক।

ব্রিটিশ সংরক্ষণ সংস্থা রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রটেকশন অব বার্ডস (আরএসপিবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এবারের বসন্তে গাছটিতে নতুন কোনো পাতা গজায়নি। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ১ হাজার ২০০ বছর বয়সী ওক গাছটি মারা গেছে।



এবারের বসন্তে গাছটিতে নতুন কোনো পাতা গজায়নি। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ১ হাজার ২০০ বছর বয়সী ওক গাছটি মারা গেছে।


২৮ মিটার (৯২ ফুট) বিস্তৃত ছাউনি এবং ১১ মিটার (৩৬ ফুট) পরিধির কাণ্ড নিয়ে এ মেজর ওক ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন গাছগুলোর একটি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গাছটির কিছু ডালের জন্য কৃত্রিম সাহায্য বা সাপোর্ট বসানো হয়েছিল এবং ১৯৭০-এর দশকে গাছটির চারপাশে বেড়া দেয়া হয়।

আরএসপিবির মতে, অতিরিক্ত চাপের কারণে চারপাশের মাটি শক্ত হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি ধারাবাহিক গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল মিলিয়ে অবনতি হয়েছে গাছটির।

এ ওকের পরিচর্যাকারী দলের সদস্য এবং মৃত্তিকা অণুজীববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান সয়েলবায়োল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইমন পারফে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা প্রতীকী গাছটির চারপাশের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক প্রাণের লক্ষণও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ক্ষতিটা এত গভীরভাবে প্রোথিত যে তা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।’

রবিন হুডের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মেজর ওক বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ছবি: আরএসপিবি



শেরউড জঙ্গলে রবিন হুডের বিখ্যাত মেজর ওক পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল।


পর্যটকদের ভিড়ও ক্ষতির কারণ

রবিন হুডের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মেজর ওক বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর ফলে আসা লাখো দর্শনার্থীর কারণে গাছটির চারপাশের মাটি কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে যায় বলে জানিয়েছে আরএসপিবি।

শেরউড বনভূমিতে আরএসপিবির এস্টেট অপারেশনস ম্যানেজার ক্লোয়ি রাইডার বলেন, ‘গাছটি বিপুল পরিমাণ মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে।’

গাছটির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী বৃক্ষবিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান আরবার ফরেস্ট্রির আর্বোরিকালচার পরিচালক রেগ হ্যারিস বলেন, গত কয়েক বছর পাঁচটি খুব গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্ম দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০২২ সালের জুলাই। ওই সময় যুক্তরাজ্যে তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে।



মধ্য ইংল্যান্ডের নটিংহামের কাছে শেরউড ফরেস্টে ঐতিহ্যগতভাবে জঙ্গলটি রবিন হুডের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। 


সত্যিই কি রবিন হুডের আস্তানা ছিল

মধ্য ইংল্যান্ডের নটিংহামের কাছে অবস্থিত শেরউড ফরেস্টের অবস্থান। ঐতিহ্যগতভাবে জঙ্গলটি রবিন হুডের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। রবিন হুড ছিলেন এমন এক কিংবদন্তি দস্যু, যিনি ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তার শত্রু ছিলেন নটিংহামের শেরিফ, যাকে ফাঁকি দিতে বনভূমিতে বসবাস করতেন।

রবিন হুডের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৪শ শতকে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় তাকে নিয়ে অসংখ্য বই রচনা হয়েছে। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়েছে এ দস্যুকে।

তবে মেজর ওক গাছটি কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও, ইংল্যান্ডের দুরহাম ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালেক্স ব্রাউন বলেন, ‘রবিন হুড সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রাচীন মধ্যযুগীয় কাহিনিগুলোয় এই ওক গাছটির কোনো নির্দিষ্ট উল্লেখ নেই।’

তবে তিনি বলেন, প্রাচীন গল্পগুলোয় রবিন হুড ও তার সঙ্গীদের বিশেষ মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত কিছু গাছের উল্লেখ আছে, যেগুলোকে বলা হতো ‘ট্রিস্টল ট্রি’। মানুষ জানত, এসব গাছের কাছেই রবিন হুডকে পাওয়া যাবে।

ব্রাউন আরো বলেন, ‘অবশ্যই এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, কিংবদন্তির একেবারে শুরুর দিক থেকেই এ সাক্ষাৎস্থল কোনো বিশেষ ও দৃষ্টিনন্দন গাছের সঙ্গে যুক্ত ছিল।’


মৃত্যুর পরও থাকবে বনভূমির অংশ

মেজর ওক গাছটি এখন আর জীবিত নয়, তবুও এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই এটি রাখা হবে।

শেরউড বনভূমিতে আরএসপিবির জ্যেষ্ঠ সাইট ম্যানেজার হলি ড্রেক বলেন, ‘মেজর ওক শেরউডের হৃদয়ে একটি প্রাকৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে। এটি রবিন হুডের কিংবদন্তির অংশ হয়ে বেঁচে থাকবে এবং জীবিত অবস্থায় যেমন বনভূমির বাস্তুতন্ত্রকে সহায়তা করেছে, মৃত্যুর পরও তেমন অবদান রেখে যাবে।’

গাছটির অ্যাকর্ন (ওকের ফল) ও ডাল থেকে আগে বহু চারা তৈরি করা হয়েছিল, যেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উইনফিল্ড হাইজ, যা লন্ডনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবন।

ক্লোয়ি রাইডারের মতে, যথাযথ পরিচর্যা করা হলে মেজর ওক ‘আরো কয়েক দশক, এমনকি কয়েক শতাব্দী’ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।



ওয়াইএফ/০৪

এক্সক্লুসিভ