মতামত



ভার্জিনিয়া পিয়েত্রোমার্কি

মার্চ / ০১ / ২০২৬


আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি : ইরানের প্রতিরোধনীতির রূপকার


73

Shares


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির কমপাউন্ডে আঘাত হানার পর তিনি নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, খামেনি এবং অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তারা “যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নজরদারি ও উন্নত ট্র্যাকিং প্রযুক্তি থেকে পালাতে পারেননি।”

১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন খামেনি, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর। খোমেনি ছিলেন সেই ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যিনি এক দশক আগে ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

যেখানে খোমেনি পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি ছিলেন, সেখানে খামেনিই গড়ে তোলেন সেই সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো, যা একদিকে ইরানকে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা দেয় এবং অন্যদিকে দেশের সীমান্তের বাইরেও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘস্থায়ী সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন — এই দুই বিষয় বহু ইরানির মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি খামেনির গভীর অবিশ্বাস জন্ম নেয়।

এই মনোভাবই তার কয়েক দশকের শাসনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় এবং ইরানকে সবসময় বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রাখার ধারণাকে শক্তিশালী করে।

ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও Iran’s Grand Strategy: A Political History গ্রন্থের লেখক ভ্যালি নাসর বলেন, “অনেকে ইরানকে ধর্মতন্ত্র মনে করেন, কারণ খামেনি পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রের ভাষা ধর্মীয়। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুদ্ধ শেষে এই ধারণা নিয়ে বেরিয়ে আসেন যে ইরান দুর্বল এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে। তার বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন; এবং বিপ্লব, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ—এগুলো আলাদা নয়, বরং সেগুলোকে রক্ষা করতে হবে।”

এই দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। খামেনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” ধারণা প্রচার করেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা যায়। তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে সংশয়ী ছিলেন এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।

তবে তার শাসন বিভিন্ন সময়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে—২০০৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতিবাদে এবং ২০২২ সালে নারীর অধিকার আন্দোলনের সময়।

সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে জানুয়ারিতে, যখন অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে বিস্তৃত আন্দোলনে রূপ নেয় এবং অনেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের আহ্বান জানান। সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর অন্যতম সহিংস পরিস্থিতির জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাওয়া তরুণ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।

নাসর বলেন, “জাতীয় স্বাধীনতার এই মাত্রার ওপর জোর দেওয়ার জন্য ইরানিদের অত্যন্ত উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে — শেষ পর্যন্ত তিনি জনগণের আস্থা হারান।”


শিক্ষা ও শৈশব

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তার পিতা ছিলেন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা এবং প্রতিবেশী ইরাক থেকে আগত জাতিগত আজারবাইজানি। পরিবার প্রথমে তাবরিজে বসবাস শুরু করলেও পরে মাশহাদে চলে আসে, যেখানে তার পিতা একটি আজারবাইজানি মসজিদের ইমাম ছিলেন।

খামেনি তার মা খাদিজেহ মিরদামাদিকে কোরআন ও বইপাঠে আগ্রহী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার কাছ থেকেই তিনি সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা পান।

চার বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চবিদ্যালয় শেষ না করে তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। নাজাফ ও কুমের শিয়া উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনা করেন।

কুমে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনিসহ বহু প্রখ্যাত আলেমের সান্নিধ্যে আসেন।

রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে শাহের গোপন পুলিশ সাভাকের হাতে বহুবার গ্রেপ্তার হন এবং নির্বাসনে পাঠানো হয়।


সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উত্থান

রাজতন্ত্র পতনের পর তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পরে আইআরজিসির তত্ত্বাবধায়ক হন। ১৯৮১ সালে এক হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান, কিন্তু ডান হাতের ব্যবহারক্ষমতা হারান। একই বছর তিনি ইরানের প্রথম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সংবিধান সংশোধন পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়।

প্রথম দিকে তার নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং সামরিক শক্তি জোরদার করা।


সংস্কার বনাম প্রতিরোধ

১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির নির্বাচনী বিজয় পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের আশা জাগায়। কিন্তু খামেনি পশ্চিমের প্রতি সন্দেহ বজায় রাখেন।

তিনি আইআরজিসিকে অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ দেন এবং বাসিজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ জোরদার করেন। ২০০৯ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত নির্বাচনের পর যে গ্রিন মুভমেন্ট শুরু হয়, তা কঠোরভাবে দমন করা হয়।


পারমাণবিক চুক্তি ও উত্তেজনা

২০১৫ সালে হাসান রুহানির নেতৃত্বে জেসিপিওএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন। এরপর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, যদিও দেশটি দাবি করে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।

২০০৩ সালে খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করে ফতোয়া জারি করেছিলেন।


“প্রতিরোধের অক্ষ”

খামেনির কৌশল ছিল সীমান্তের বাইরে “ফরোয়ার্ড ডিফেন্স” গড়ে তোলা। কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি এই নীতির প্রধান স্থপতি ছিলেন। লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ, ফিলিস্তিনে হামাস, ইয়েমেনে হুথি এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ছিল এই জোটের অংশ।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে লেবানন, সিরিয়া ও ইরানে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। খামেনি আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।


শেষ অধ্যায়

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকে। ডিসেম্বরের বিক্ষোভ সহিংস দমন-পীড়নে রূপ নেয়। হাজারো মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে।

নতুন করে আলোচনার চেষ্টা হলেও বড় অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার দাবি জানায়, যা তেহরান প্রত্যাখ্যান করে।

ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ট্রাম্প “বড় ধরনের সামরিক অভিযান” শুরু করার ঘোষণা দেন এবং ইরানি জনগণকে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

খামেনি কঠোর জবাব দেন—

“যারা ইরান ও তার ইতিহাস জানে, তারা কখনো হুমকির ভাষায় কথা বলবে না। ইরানি জাতি আত্মসমর্পণ করবে না।”


আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন-ওয়াইএএফ


ওয়াইএফ/০১

মতামত