মতামত



ইয়াশরাজ শর্মা

জুন / ১৯ / ২০২৬


ট্রাম্প–নেতানিয়াহু টানাপোড়েন: আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে বিরোধ হয়েছে?


20

Shares


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের যে চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এই চুক্তির বিরোধিতা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৭ জুন বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই করার পরও ইসরায়েল লেবাননে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা চুক্তির লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।

লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে তিনি বলেন, লেবাননের বিষয়ে নেতানিয়াহুকে ‘আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’ ইসরায়েলের অভিযান ও হিজবুল্লাহ মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এতে খুশি নই।’ এর আগে রবিবার ইরানের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করেন ট্রাম্প।


ইসরায়লের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে মতবিরোধের খবর প্রকাশ করেছে। তবে এসব উত্তেজনা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন কমাতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজা যুদ্ধ বন্ধের যে চুক্তি হয়েছিল, তা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করার সুযোগ দিয়েছে।

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ্য বিরোধের পরও দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং ইসরায়েলের জন্য সামরিক সহায়তা অব্যাহত থেকেছে।

২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করার জন্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু এরপরও ওবামা প্রশাসন ইসরায়েলকে দুই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা প্যাকেজ—৩৮ বিলিয়ন ডলার—দিয়েছিল।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোর ইতিহাস:

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বর্তমান বিরোধ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তিতে ক্ষুব্ধ ইসরায়েল। ওই চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে লেবাননের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী সেখান থেকে সরবে না।

বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়েও বিরলভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘অনেক বেশি মানুষ মারা গেছে। কাউকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান নিয়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোও জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য সফর, ইরান ও হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘বিবি, তুমি বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে না।’


আগেও কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে বিরোধ হয়েছে?

আইজেনহাওয়ার বনাম বেন-গুরিয়ন (১৯৫৬–৫৭)

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংঘাতগুলোর একটি হয়েছিল সুয়েজ সংকটের সময়। মিশর সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করার পর ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মিলে মিশরে হামলা চালায়। এতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ক্ষুব্ধ হন।

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, এই যুদ্ধ আরব বিশ্বে সোভিয়েত প্রভাব বাড়াবে। আইজেনহাওয়ার প্রকাশ্যে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের হুমকি দেন। শেষ পর্যন্ত মিশর সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ওপর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফল চাপ প্রয়োগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটি।



ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক শামির ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে সাক্ষাৎ করেন। [ইরা শোয়ার্জ/রয়টার্স]

বুশ বনাম শামির (১৯৯১–৯২)

উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আরব-ইসরায়েল শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেন এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক শামিরের চাওয়া ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ গ্যারান্টি আটকে দেয় বুশ প্রশাসন। কারণ, বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগের সমাধান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বুশ তখন কংগ্রেসে নিজেকে ‘একজন একাকী ছোট মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, ইসরায়েলপন্থী লবির চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। তবে এর ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়নি; বরং পরবর্তী সরকারগুলোর সময় সহযোগিতা আরও বেড়েছে।



ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, জর্ডানের রাজা হুসেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৯৯৬ সালের ১ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিষয়ক একটি দলীয় শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনে সমবেত হন [উইন ম্যাকনামি/রয়টার্স]

ক্লিনটন বনাম নেতানিয়াহু (১৯৯৬–৯৯)

১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার এক মাস পরই নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বৈঠক হয়। তবে সম্পর্কের শুরুটা ভালো ছিল না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকের পর ক্লিনটন তাঁর সহযোগীদের বলেছিলেন, ‘সে নিজেকে কী মনে করে? এখানে আসল পরাশক্তি কে?’

ক্লিনটন সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিনের শুরু করা অসলো শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনশীল ছিলেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের শর্তের বিরোধিতা করেন। তবে সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও ক্লিনটন ১৯৯৮ সালের ওয়াই রিভার সমঝোতায় ভূমিকা রাখেন।



ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০০৯ সালের ১৮ মে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার (ডানে) সাথে সাক্ষাৎ করছেন।

ওবামা বনাম নেতানিয়াহু (২০০৯–১৬)

সাম্প্রতিক দশকে এটি ছিল সবচেয়ে প্রকাশ্য বিরোধ। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার কারণে ওবামা-নেতানিয়াহু সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।

২০১৫ সালে নেতানিয়াহু রিপাবলিকানদের আমন্ত্রণে মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেন এবং ওবামার ইরান নীতির সমালোচনা করেন। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই এই বক্তব্য দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় ওবামা প্রশাসন।

নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, ইরানের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তি ‘ইরানকে পারমাণবিক বোমার পথে নিয়ে যাবে।’ তবে এর এক বছর পরই ওবামা প্রশাসন ইসরায়েলকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়। হোয়াইট হাউস তখন বলেছিল, ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি অটুট।’


ইসরায়েল কি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ?

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক এখনো জটিল। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে পছন্দ করেন, কারণ তাঁর মধ্যে নিজের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পান—লেনদেনভিত্তিক চিন্তা, নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা।’ তাঁর মতে, নেতানিয়াহুও যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝেন এবং মনে করেন তিনি পরিস্থিতি নিজের মতো করে পরিচালনা করতে পারেন। 

তবে মেকেলবার্গ বলেন, এখন ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে এমন এক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যেখানে ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক কোনো এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। দুই দেশের স্বার্থ ও মূল্যবোধের মিল রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি দ্বিদলীয় সমর্থন কমছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় ইসরায়েলকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু নেতানিয়াহুর সময়ে এখন অনেকের কাছে ইসরায়েল একটি বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’


  • আল-জাজিরায় ইয়াশরাজ শর্মা‘র এক্সপেইন দেশদর্পণ-এর জন্য অনুবাদ করেছেন সানজিদা আলী। 

--- 



মতামত