আইন-আদালত



সজীব পাল

জুন / ২০ / ২০২৬


বিশ্ব শরণার্থী দিবস, শরণার্থী আইন ও আমাদের দায়বদ্ধতা


52

Shares


প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শরণার্থী দিবস। যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ধর্মীয় বৈষম্য কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে যারা নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তাদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

শরণার্থীদের অধিকার ও আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল হলো ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন বা শরণার্থী কনভেনশন। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রণীত এই বহুপাক্ষিক চুক্তিতে বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ অংশগ্রহণ করেছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যেমন বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এখনো এ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।


প্রথমেই প্রশ্ন আসে, শরণার্থী কারা?

১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১ অনুযায়ী, এমন ব্যক্তি শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন, যিনি জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের আশঙ্কা বা নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজ দেশের সুরক্ষা গ্রহণে অনিচ্ছুক বা অক্ষম এবং ফলে নিজ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

এখানে শরণার্থী ও অভিবাসীর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অভিবাসীরা সাধারণত উন্নত জীবন, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগের সন্ধানে অন্য দেশে যান। অন্যদিকে শরণার্থীরা জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শরণার্থী হিসেবে কোনো দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করা কি অপরাধ?

রিফিউজি কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রসমূহে শরণার্থীদের অবৈধ প্রবেশ বা অবস্থান শুধুমাত্র এ কারণে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে তাদের অবশ্যই অযথা বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের অবস্থান ও প্রবেশের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

শরণার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১৬-এ আদালতে প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশের আদালতে মামলা দায়ের করতে, অধিকার দাবি করতে এবং আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।

এ ছাড়া অনুচ্ছেদ ৩ ও ৪ অনুযায়ী শরণার্থীদের সঙ্গে জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের অধিকারও স্বীকৃত। একইভাবে অনুচ্ছেদ ১৭, ১৮ ও ১৯-এ কর্মসংস্থান, স্ব-নিযুক্ত পেশা এবং পেশাগত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। শিক্ষা ও বাসস্থানের ক্ষেত্রেও আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে।


এখন প্রশ্ন হলো, আশ্রয়দাতা দেশ কি কোনো শরণার্থীকে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে?

সাধারণত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক আইন এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনের আলোকে। কোনো ব্যক্তির আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি আপিল করতে পারেন। আপিল প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি আইনগতভাবে সেই দেশে অবস্থান করতে পারেন। চূড়ান্তভাবে আপিল খারিজ হলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তাকে স্বেচ্ছায় দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিতে পারে। নির্দেশ অমান্য করলে তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।

তবে রিফিউজি কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩৩-এ বর্ণিত “নন-রিফাউলমেন্ট” (Non-Refoulement) নীতি আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম ভিত্তি। এ নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবশ্য এ নীতিরও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি কোনো শরণার্থী আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হন অথবা গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে রাষ্ট্র তাকে বহিষ্কার বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে তাকে গ্রহণ করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

মূলত ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া বা অনুগ্রহ প্রদর্শনের দলিল নয়। বরং এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, যার লক্ষ্য হলো শরণার্থীদের জীবন, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে এই মৌলিক মানবিক ও আইনি অঙ্গীকারের কথাই আমাদের নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন।


লেখক:  মৌলভীবাজার জজ কোর্টের আইনজীবী

আইন-আদালত