30
Sharesআইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচের ৬৮ মিনিটে যখন সমতায় ফেরালেন জার্মানিকে, তখনও গল্পটি অসম্পূর্ণ ছিল। আর ৯৪ মিনিটে যখন জয়সূচক গোলটি জালে জড়িয়ে দিলেন, তখন যেন পূর্ণ হলো এক দীর্ঘ যাত্রার উপন্যাস। জার্মানির ২-১ গোলের জয়, নকআউট পর্বের টিকিট, আর রাতের নায়ক ডেনিজ উন্দাভ। কিন্তু বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির গল্প শুধু দুটি গোলের নয়। এটি এমন এক ফুটবলারের গল্প, যিনি একসময় ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে কারখানার শিফটে যেতেন। যাকে বলা হয়েছিল, সে যথেষ্ট লম্বা নয়, যথেষ্ট ফিট নয়, যথেষ্ট ভালোও নয়। সেই ছেলেটিই আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির ত্রাতা।
![]()
কখনো কখনো ফুটবল এমন কিছু গল্প লিখে, যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। ডেনিজ উন্দাভের জীবন ঠিক তেমনই।
জার্মানিতে জন্ম হলেও তার শিকড় তুরস্কের কুর্দিশ পরিবারে। ছোটবেলায় ফুটবলের স্বপ্ন নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ভেয়ার্ডার ব্রেমেনের যুব একাডেমিতে। কিন্তু সেখানেই আসে প্রথম বড় আঘাত। অতিরিক্ত ওজন এবং উচ্চতা কম হওয়ার অজুহাতে তাকে ছেড়ে দেয় ক্লাবটি।
কিশোর উন্দাভ তখন প্রায় ৮৫ কেজি ওজনের ছিলেন। হতাশা তাকে গ্রাস করেছিল। অনেকের জায়গায় গল্প সেখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু উন্দাভ হার মানেননি। কঠোর ডায়েট শুরু করেন, দৌড়ান দিনের পর দিন। ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজন কমিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলেন। তবু ফুটবল তাকে তখনও গ্রহণ করেনি।
বেঁচে থাকার জন্য কাজ নিতে হয় একটি উৎপাদন কারখানায়। প্রতিদিন আট ঘণ্টার কঠিন শিফট। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়া, তারপর বিকেলে জার্মানির চতুর্থ ও পঞ্চম বিভাগের অপেশাদার ক্লাবগুলোর হয়ে ফুটবল খেলা। স্বপ্ন তখনো ছিল, কিন্তু সেটি যেন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কোনো আলো। সেই আলো আবার দেখা দেয় ২০২০ সালে।
বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয়াজ তাকে সুযোগ দেয়। জীবন বদলে যায় সেখানেই। গোলের পর গোল করতে থাকেন উন্দাভ। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ক্লাবটি প্রথম বিভাগে উঠে আসে। এরপরও থামেননি। প্রথম বিভাগে ২৬ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। সেই গোলগুলো তাকে পৌঁছে দেয় ইংল্যান্ডে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়ন তাকে দলে ভেড়ায়। কিন্তু রূপকথার গল্পেও তো সব অধ্যায় সুখের হয় না।
২০২২ সালে ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয়াজে থাকাকালে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন উন্দাভ। ঠিক সেই সময় তার এজেন্ট ফোন করে জানান, ব্রাইটন তাকে কিনতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। জীবনের অন্যতম আনন্দের দিনে আরেকটি স্বপ্নপূরণের খবর পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ব্রাইটনে গিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
ইংরেজি ভাষা, নতুন পরিবেশ, একাকীত্ব, পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ না পাওয়া, আর ইংল্যান্ডের বিষণ্ণ আবহাওয়া তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। পরে নিজেই স্বীকার করেছিলেন, বেঞ্চে বসে থাকা এবং মানিয়ে নিতে না পারা তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। কোচ রবার্তো দে জের্বির অধীনে নিয়মিত সুযোগও পাচ্ছিলেন না।
এই সময়ই তিনি খোলাখুলিভাবে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বলেন, ব্রাইটনে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সেই মন্তব্য নিয়ে ইংলিশ ফুটবল মহলে সমালোচনাও হয়েছিল। ২০২৩ সালে তাই ধারে যোগ দেন স্টুটগার্টে।
![]()
জার্মানিতে ফেরার পর যেন আবার নিজের ঘরে ফিরে আসেন তিনি। স্টুটগার্ট থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে চলে যেতেন উত্তর জার্মানির হ্যাভলসে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, মায়ের হাতের রান্না খেতে। পরিচিত পরিবেশ তাকে ফিরিয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস। এরপর যা ঘটেছে, তা প্রায় বিস্ময়ের গল্প।
প্রথম বুন্দেসলিগা মৌসুমেই ১৮ গোল করে স্টুটগার্টকে রানার্সআপ হতে বড় ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তাকে স্থায়ীভাবে দলে নিতে স্টুটগার্ট ও ব্রাইটনের মধ্যে দীর্ঘ দরকষাকষি ও জটিলতা তৈরি হয়। উন্দাভ প্রকাশ্যেই স্টুটগার্টে থাকার ইচ্ছা জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি থেকে যান এবং ২০২৬ সালের ১ জুন নতুন চুক্তি করেন, যা ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর। সঙ্গে রয়েছে আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ।
সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ মৌসুমে স্টুটগার্টের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৬ ম্যাচে করেছেন ২৫ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট। শুধু বুন্দেসলিগাতেই ২৯ ম্যাচে ১৯ গোল। ইউরোপা লিগে ১০ ম্যাচে ৩ গোল ও ৫ অ্যাসিস্ট। তার পাসিং নির্ভুলতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং তৈরি করেছেন ২৪টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ।
উন্দাভ শুধু গোলদাতা নন। দুই পায়েই সমান দক্ষ। বক্সের ভেতরে তার ফিনিশিং অসাধারণ। আবার প্রয়োজন হলে ফলস-নাইন হয়ে নিচে নেমে সতীর্থদের জন্য সুযোগও তৈরি করেন। যদিও অফসাইড ট্র্যাপ এড়ানো এবং রক্ষণাত্মক কাজে অবদান রাখাকে এখনো তার দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
তার ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতীয় দল। তুরস্কও তাকে নিজেদের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুর্কি সমর্থকদের চাপও ছিল ব্যাপক। কিন্তু উন্দাভ বেছে নেন জার্মানিকে। তিনি একবার বলেছিলেন, “যে দেশ আমাকে বড় করেছে, যে দেশের ফুটবলে আমি বড় হয়েছি, আমি সেই জার্মানির জার্সিতেই খেলতে চাই।”
সিদ্ধান্তটি সবাই ভালোভাবে নেয়নি। তুরস্কের অনেক সমর্থক তাকে সমালোচনা করেছিলেন, কেউ কেউ ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও আক্রমণ করেছিলেন। তবু নিজের পথ বদলাননি।
২০২৪ সালের মার্চে যখন প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পান, তখনও বিশ্বাস করতে পারেননি। কোচ জুলিয়ান নাগালাসমান ফোন করলে তিনি নাকি ভেবেছিলেন, কোনো বন্ধু মজা করছে। হাসতে হাসতে পরে বলেছিলেন, “আমি তো প্রায় ফোন কেটে দিতে যাচ্ছিলাম। পরে বুঝলাম, সত্যিই নাগেলসম্যান কথা বলছেন!”
সেই বছরই ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হয় তার। ইউরো ২০২৪ স্কোয়াডেও ছিলেন। আর এখন ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্মানির সবচেয়ে কার্যকর ‘ইমপ্যাক্ট সাব’দের একজন।
গ্রুপ পর্বে মাত্র দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে করেছেন ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট। এর মধ্যে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে এই জোড়া গোলই সবচেয়ে স্মরণীয়।
উন্দাভকে আলাদা করে তোলে তার ব্যক্তিত্বও। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি কখনোই কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন না। একবার রেফারির সিদ্ধান্তকে সরাসরি “ভয়াবহ এবং হাস্যকর” বলেছিলেন। এজন্য সতর্কবার্তাও পেয়েছিলেন।
হাস্যরসও তার চরিত্রের অংশ। হ্যারি কেইনের সঙ্গে তুলনা টানলে একবার বলেছিলেন, “হ্যারি কেইন বিশ্বমানের স্ট্রাইকার। আর আমি তো এক বছর আগেও কারখানায় কাজ করার কথা ভাবতাম। কেইন হয়তো দামি গলফ ক্লাবে সময় কাটায়, আমি এখনো মায়ের হাতের তুর্কি কাবাব খেতে পছন্দ করি। আমাদের মিল শুধু একটাই, আমরা দুজনেই গোল করতে ভালোবাসি।”
মাঠেও তিনি অদ্ভুত সব কৌশল ব্যবহার করেন। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের নাকি মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করেন, “ম্যাচ শেষে ডিনারে কী খাবে?” কিংবা “চুল কাটলে কোথায়?” ডিফেন্ডাররা যখন অবাক হয়ে যায়, তখনই সুযোগ খুঁজে নেন তিনি।
আজ বিশ্বকাপের গ্যালারি থেকে তাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই মানুষটি একসময় কারখানার শ্রমিক ছিলেন। বোঝার উপায় নেই, তাকে একদিন বলা হয়েছিল সে যথেষ্ট ভালো নয়। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সবচেয়ে সুন্দর উত্তরগুলো দেয় মাঠেই।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ৬৮ ও ৯৪ মিনিটে করা দুটি গোল শুধু জার্মানিকে নকআউট পর্বে তোলেনি। সেই গোল দুটি যেন আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা প্রতিভার অভাব নয়, বরং হাল ছেড়ে দেওয়া।
ডেনিজ উন্দাভ হাল ছাড়েননি। আর তাই আজ বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটিকে দেখে মনে হয়, কখনো কখনো অসম্ভবও সত্যি হয়।
ওয়াইএফ/০৬