রাজনীতি



নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিসেম্বর / ৩০ / ২০২৫


শতাধিক আসনে একাধিক প্রার্থী বিএনপির


173

Shares


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে শতাধিক আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তবে এসব প্রার্থীর অনেকেই ‘কৌশলগত’ কারণে দলের সংকেত পেয়েই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। আবার কোনো কোনো প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রার্থী হয়েছেন। তবে এসব প্রার্থীর মধ্যে কতজন বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন তা সময় এলেই বোঝা যাবে।

এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত।

আপিল নিষ্পত্তি করা যাবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২১ জানুয়ারি। আর ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

বিএনপি সূত্র জানায়, বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে এবার দলের অবস্থান কঠোরতর। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে বহিষ্কার করা হতে পারে। কারণ বিএনপিতে থেকে ধানের শীষের বাইরে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। তবে দলের সংকেত পেয়ে বিকল্প হিসেবে যাঁরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ে তা প্রত্যাহার করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোনো কোনো আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলের বহু কারণ রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত মামলা,  ঋণখেলাপিসহ নানা কারণে কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাদ পড়তে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসনে বিএনপির অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়ে থাকলে তাঁর কপাল খুলতে পারে। আবার জনসমর্থন বিবেচনায় কোনো আসনে শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা পরিবর্তনও হতে পারে। ফলে ২০ জানুয়ারির পরই মূল চিত্র বের হয়ে আসবে। তখন বোঝা যাবে বিএনপি থেকে কতজন বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। তিনি মরমি কবি হাছন রাজার প্রপৌত্র এবং জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন বলেন, ‘আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠা থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত। আমার একাধিকবার নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা আছে। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের দাবি ও উৎসাহে আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।’

সুনামগঞ্জ-৫ আসনে (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ (মিলন)। এ আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মনোনয়নবঞ্চিত নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনটি জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীবকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এই আসন থেকে বিএনপির জেলা কমিটির সদস্য ও সাবেক যুবদল নেতা এস এন তরুণ দে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমাদান শেষে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার বাইরে। আল্লাহর এই পরিকল্পনায় আমার বাবা (অলি আহাদ) ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের জোয়ারের বিপক্ষে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছিলেন। রাব্বুল আল-আমিনের কী অদ্ভুত পরিকল্পনা, ২০২৬ সালে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে।’

নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির প্রয়াত নেতা ফজলুর রহমান পটলের ছোট মেয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুলকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। সেখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম ছাড়াও হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর উদ্দিন রাজীব মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

সুনামগঞ্জ-১ আসনে (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর) বিএনপি থেকে প্রথমে মনোনয়ন পান জেলা কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক। পরে আবার দলীয় মনোনয়নের কথা জানান জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল। দুজনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই ও শাল্লা) বিএনপি থেকে প্রথমে মনোনয়নপত্র জমা দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির চৌধুরী। পরে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক তাহির রায়হান চৌধুরীও (পাভেল) মনোনয়নপত্র জমা দেন। 

ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসন থেকে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। একই আসনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা মোহাম্মদ সালমান ওমর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম দলীয় মনোনয়ন পাননি। তবে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়তে চান। তিনিও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে এবার বিএনপি থেকে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। গত রবিবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা চিঠি তাঁকে দেওয়া হয়। এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর একই আসনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। একই আসনে তাঁরা দুজনই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, এ আসনে দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে একজনকে প্রার্থী রাখবে। কাকে রাখবে তা পরে জানা যাবে।

সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বিএনপির দুই প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রথমে অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে আবার সিলেট জেলা বিএনপি নেতা ফয়সল আহমদ চৌধুরীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাঁরা দুজনই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান ও জেলা বিএনপির সদস্য কবির আহমেদ ভূঁইয়া জমা দিয়েছেন মনোনয়নপত্র।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত এম এ মান্নানের পাশাপাশি দলের আরেক নেতা কাজী নাজমুল হোসেন তাপস মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপি নেতা এম এ হান্নানের পাশাপাশি সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান সুখন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলের পাশাপাশি মো. নূরে আলম সিদ্দিকী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।

পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি জোট হিসেবে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। একই আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। 

বগুড়া-৭ (শাহজাহানপুর-গাবতলী) ও ফেনী-১ (ফুলগাজী-পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। দুটি আসনেই ‘বিকল্প প্রার্থী’ রেখেছে বিএনপি। বগুড়া-৭ আসনে ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোর্শেদ মিল্টনও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফেনী-১ আসনে ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির আহ্বায়ক মুন্সী রফিকুল আলম মজনুও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের প্রধান মাহমুদুর রহমান মান্না মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেরও প্রার্থী। সেখানেও ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এ ছাড়া বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সেখানে সোনাতলা উপজেলার বিএনপির সভাপতি আহসান তৈয়ব জাকিরও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নেত্রকোনা-৪ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সিলেট-২ আসনে নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর পাশাপাশি তাঁর ছেলে আবরার ইলিয়াসও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।


ওয়াইএফ/০২

রাজনীতি