সিলেট প্রতিক্ষণ



নিজস্ব প্রতিবেদক

ফেব্রুয়ারী / ০৭ / ২০২৬


‘যারা জনগণের টাকা চুরি করেছে দায়িত্ব পেলে তাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না: ডা. শফিক


77

Shares


সিলেট নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘দায়িত্ব পেলে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের চেহারা পাল্টে যাবে।’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘যারা জনগণের টাকা চুরি করেছে আমরা দায়িত্ব পেলে তাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। তাদের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেটের ভেতর থেকে টাকা বের করে আনবো।’ 

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ, সিলেট ও সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা, জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে সিলেটবাসীর কাছে ভোট চেয়ে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একবার আমাদের সুযোগ দিন। আপনাদের মালিক হব না। আপনাদের জীবন, সম্পদ আর ইজ্জতের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা চৌকিদারের কাজ করব। পাহারা দেব ইনশাআল্লাহ।’

দায়িত্ব পেলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আমাদের যদি এ দেশের সেবকের দায়িত্ব দেন তাহলে প্রিয় বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটির উপরে কেউ আর চাঁদাবাজির হাত বাড়ানোর সাহস করতে পারবে না। আমরা ঘোষণা দিয়েছি কোনো অফিস, আদালত, কার্যালয় এখন থেকে আমরা যদি সুযোগ পাই, আল্লাহ তায়ালা সুযোগ দেন কারো ঘুষ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না এবং ঘুষ খাওয়ার সাহস হবে না।’ 

দেশের সমস্ত নাগরিক সম্মানের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগ পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে বেতনভাতা সুবিধা দেওয়া হয়, সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের জন্য সেটি ইনসাফ ভিত্তিক নয়, পর্যাপ্ত নয়। আপনি তার একান্ত প্রয়োজন পূরণ না করলে, সে যদিও প্রয়োজন পূরণের জন্য সে যদি কোনো অপরাধ করে রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নাই ওই নাগরিককে শাস্তি দেওয়ার। আগে তাকে বাচার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তারপর সে লোভ করলে তার বিচার হবে।’

চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এসময় বলেন, ‘জনগণের টাকা যারা চুরি করেছে আল্লাহতায়ালা আমাদের দায়িত্ব দিলে আমরা তাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। ওরা দুনিয়ার যেখানেই থাকুক না কেন, জনগণের এই হক তারা যদি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়, তারা অবশ্যই এজন্য অভিনন্দিত হবে। আর যদি না দেয় রাষ্ট্র ইনশাল্লাহ ওদের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেটের ভেতর থেকে টাকা বের করে নিয়ে আসবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না ইনশাল্লাহ। সেই টাকা রাষ্ট্রিয় কোষাগারে যোগ হবে।’ তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি বন্ধ হলে, চুরি বন্ধ হলে উন্নয়নও হবে।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) ততকালীন ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন। আমরা তাঁরই উত্তরসূরী। বাংলাদেশ গত ৫৪ বছর ধরে জুলুমের রাজনীতি চলছে। সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার হয়েছে জামায়াত ইসলামী। তবে আমরা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরই বলেছিলাম, দল হিসেবে জামায়াত কোনো জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে না। আমরা ক্ষমা করে দিয়েছি। আমাদের নেতাকর্মীরা কথা রেখেছেন। দল হিসেবে আমরা প্রতিশোধ নেইনি। আমরা মামলা বাণিজ্য করেনি। কিন্তু অনেকে মামলা বাণিজ্য করেছে।’

সিলেট খনিজ সম্পদে ভরপুর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিলেটের খনিজ সম্পদের হিস্যা সিলেটবাসী পাচ্ছে না। সিলেটের সব এলাকায় এখনও গ্যাস যায়নি, বিদ্যুৎ যায়নি। নদীগুলো মেরে ফেলা হয়েছে। মদ গাঁজায় ছেয়ে গেছে সিলেট। আমরা দায়িত্ব পেলে এগুলো বন্ধ করবো। কেবল নদী খনন নয়, নদীবান্ধব হবে বাংলাদেশ।’

আমীরে জামায়াত বলেন, ‘সিলেটবাসীর জন্য সুপেয় পানি পাওয়াই এক আলাদিনের চেরাগের মতো। বসে বসে অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষা আসলেই ডুবে যায়, ভেসে যায়, আবার শুকনা মৌসুমে নদীতে কোনো পানি থাকে না। এই সব সংকট সিলেটের নিত্যদিনের সঙ্গী।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। কেবল নামেই আন্তর্জাতিক, কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এখানে নামে না। আমরা নামে নয় কাজে এই বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করব।’ সম্প্রতি ম্যানচেষ্টার টু সিলেট রুটের ফ্লাইট বন্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ইউকেতে যে সমস্ত বাংলাদেশি প্রবাসী আছেন, তাদের প্রায় ৯০ ভাগ সিলেটের বংশোদ্ভূত। ম্যানচেস্টার একটা গুরুত্বপূর্ণ হাব। সেখানে নিয়মিত ফ্লাইট আগে যেত-আসত, এখন সেটা বন্ধ করে রাখা হয়েছে কেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কি চিংড়ি মাছ? চিংড়ি মাছ দৌড়াতে শুরু করলে শুধু পিছনের দিকে যায়। আমরা তো সিংহের থাবা মেলে সামনে আগাতে চাই।’ দায়িত্ব পেলে বন্ধ থাকা রুটগুলো পুনরায় চালু করা হবে এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুটও খোলা হবে বলে তিনি আশ^াস দেন।

নদী ও পরিবেশ সংকটের কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘বাংলাদেশের নদীগুলো মরে গেছে। সিলেটের  নদীগুলোও মরে আছে। নদী রাগ করে কেন? তার হক দেওয়া হয় না। তার পেট ভরাট করে দেওয়া হয়েছে, দখল করা হয়েছে, ময়লা আবর্জনা দিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নদী শাসন নয়, নদীবান্ধব বাংলাদেশ হবে ইনশাআল্লাহ। সুরমা-কুশিয়ারা যেন শুধু বইয়ের পাতায় না থাকে, বাস্তবে যেন পাওয়া যায় সেই সুরমা-কুশিয়ারা বানানো হবে।’

হাওরাঞ্চল, কৃষি ও মৎস্য খাতের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সুনামগঞ্জের হাওর-বাওর এলাকা থেকে দেশের খাদ্যের একটা বড় অংশ আসে। অথচ এই এলাকাগুলো অবহেলিত। বাঁধ ভাঙে, ফসল নষ্ট হয়। যারা বাঁধের টাকা পেটের ভেতরে ঢুকায়-এই ইঁদুরগুলো আর বাঁধ কাটার সুযোগ পাবে না।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষকদের কাছে সরঞ্জাম তুলে দেবো। কৃষিপণ্যের বাজার নিশ্চিত করা হবে। জেলেদের হাতে জাল দেওয়া হবে। জাল যার জলা তার হবে। চা বাগানের সন্তানদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে।’

চা-বাগান শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলোর চেহারার দিকে তাকানো যায় না। নারী-পুরুষ সবাই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। কিন্তু শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই। সন্তানরা অনাদরে বড় হয়। তারা এই দেশের নাগরিক তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে, সরকার নেবে ইনশাআল্লাহ।’

নিজের এক্স হ্যান্ডেলের একটি পোস্ট নিয়ে সম্প্রতি তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আমীরে জামায়াত বলেন, ‘একদল মা বোনদের সম্মান দিতে জানে না। আমি এর প্রতিবাদ করেছি এজন্য তারা আমার দিকে মিসাইল ছুড়েছে। আমার এক্স একাউন্ট হ্যাক করে মা-বোনদের নিয়ে অপমানজনক পোস্ট দিয়েছে। এখন তারা কী বলবে, চুর তো ধরা পড়েছে। কিন্তু এখনো তারা চুরের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। একেই বলে চুরের মায়ের বড় গলা। আমি তাদের মাফ করে দিয়েছি। আমি আর এ নিয়ে কথা বলব না।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমি এই সিলেটের সন্তান। আমি এখানে আপনাদের কোলে লালিত হয়েছি। আজ জামায়াতের আমীর হিসেবে নয়, আপনাদের একজন হিসেবে এখানে দাঁড়িয়েছি। আমাদের একবার সুযোগ দেন। আমরা দেশের মালিক বনবো না। আপনাদের চৌকিদার হবো। যার যা মর্যাদা তা নিশ্চিত করবো।’

বক্তব্য শেষে তিনি সিলেট বিভাগের দুই জেলার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে নিজ নিজ প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। 

এর আগে সকাল থেকে সিলেট জেলা ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে খন্ড খন্ড মিছিল সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলীমা মাদ্রাসা অভিমুখে আসতে শুরু করে। দুপুরের মধ্যে মাঠ ভরে উঠে। বিকেলে সমাবেশ মঞ্চে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামের আমীর। এর আগে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এর আগে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামের আমীর।



ওয়াইএফ/০১

সিলেট প্রতিক্ষণ