দেশজুড়ে



দেশদর্পণ ডেস্ক

মে / ০৪ / ২০২১


অবৈধ স্পিডবোট

ম্যানেজ করেই চলে অবৈধ স্পিডবোট


94

Shares

দেশে লকডাউন চলছে। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ। নৌযান চলাচলেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। স্বাভাবিক কারণেই পদ্মা নদীতে বন্ধ থাকার কথা যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল।

কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়েই এই পথে চলছিল যাত্রীবাহী স্পিডবোট। গতকাল সোমবার দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানির পর জানা গেল, স্পিডবোটে যাত্রী বহনের বৈধতাই নেই। ঘাট ইজারাদার, পুলিশ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে বিপরীতমুখী বক্তব্য। একেক সংস্থা দায় চাপাচ্ছে অন্য সংস্থার ওপর।

তবে স্পিডবোটের একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা পক্ষকে টাকা দিয়ে 'ম্যানেজ' করে তারা এসব অবৈধ যান চালাচ্ছেন। ঈদ সামনে রেখে সব পক্ষকে দিতে হচ্ছিল বাড়তি টাকা। এ জন্য তারা অতিরিক্ত যাত্রী ও বাড়তি ভাড়া নিয়ে স্পিডবোট চালাচ্ছিলেন। গতকাল সোমবার সকালে ৩০ যাত্রী নিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় একটি স্পিডবোট।

কাঁঠালবাড়ি ঘাটের অদূরে একটি বাল্ক্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে সেটি ডুবে যায়। এরপর বিকেল পর্যন্ত ২৬ যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত পাঁচজন। স্থানীয় লোকজন, চালক ও যাত্রীরা বলছেন, গতকালের দুর্ঘটনায় হতাহতের পর লকডাউনের মধ্যে স্পিডবোট চলার বিষয়টি সামনে এলেও তা নিয়মিতই চলাচল করছিল। খুব সকালে দুই তীরের বৈধ ঘাট থেকেই এসব যান যাত্রীদের গাদাগাদি করে চলাচল করে।

তবে দিনে ঘাটের আশপাশের এলাকা থেকে স্পিডবোটগুলো ছেড়ে যায়। শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি-বাংলাবাজার ও মাঝিরকান্দি রুটে স্বাভাবিক সময়ে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ১৫০ টাকা হলেও লকডাউনের সময়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ সময়ে ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিন ধরনের প্রায় ৪৫০টি স্পিডবোট ওই রুটে চলত। লকডাউনের এই সময়ে শতাধিক স্পিডবোট চলছিল। ছোট বোটে ১০ জন, মাঝারিতে ১৫ জন ও বড়গুলোতে ২০ জন যাত্রীর ধারণক্ষমতা থাকলেও প্রতিটিতে দ্বিগুণ যাত্রী নেওয়া হয়। তা ছাড়া বোটগুলো পুরোনো এবং অধিকাংশেরই ফিটনেস নেই।

নিবন্ধন, অনুমোদন তো নেই-ই। স্পিডবোটের একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে ইজারাদার যাত্রীপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা করে আদায় করতেন। এই টাকা থেকেই নৌ পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএসহ নানা হাতে টাকা যেত। লকডাউনে চলাচল করায় ইজারাদারদের লোকজনকে প্রতি যাত্রীর জন্য ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে।

স্পিডবোট ছাড়ার আগেই এই টাকা ইজারাদারের লোকজনকে বুঝিয়ে দিতে হয়। শিমুলিয়া ঘাটের স্পিডবোট চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন লৌহজং উপজেলার মেদিনীম ল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান। তবে ইজারা তার নামে নয়। তার ভাই মো. শাহে আলমের নামে ঘাটের ইজারা নেওয়া।

তিনি সমকালকে বলেন, 'সরকারিভাবে ঘাট বন্ধ। আমাদের লোকজনও সেখানে নেই। এজন্য কীভাবে স্পিডবোট চলে, তা দেখার দায়িত্বও আমাদের নয়। এসব দেখবে নৌপুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ।' তাদের লোকজনকে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই অবৈধভাবে এসব যান চলাচলের বিষয়ে শাহে আলমের ভাষ্য, 'এগুলো মিথ্যা কথা।

' শিমুলিয়া ঘাটে দায়িত্বরত নৌপুলিশ পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘাট থেকে যাতে স্পিডবোট ও ট্রলার ছাড়তে না পারে, সেদিকে তারা নজরদারি করছেন। নদীতেও টহল দিচ্ছেন। এর পরও চালকরা ঘাটের বাইরে চর এলাকা থেকে এগুলো ছেড়ে যায়। সব সময় নজরদারি করা সম্ভব হয় না।

প্রায় অভিন্ন কথা বলেন লৌহজং থানার ওসি আলমগীর হোসেন। তার ভাষ্য, দুর্ঘটনায় পড়া স্পিডবোটটি খুব ভোরে ছেড়ে যাওয়ায় তাদের নজরে আসেনি। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও দায় রয়েছে। কিন্তু পুলিশকে ম্যানেজ করেই এসব অবৈধ স্পিডবোট চলাচলের অভিযোগ পুলিশের এ দুই কর্মকর্তা অস্বীকার করেন।

বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ) শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, ঘাটের বাইরে দেখভালের জন্য তাদের জনবল নেই। তা ছাড়া এই স্পিডবোটগুলোর কোনো নিবন্ধন নেই।

তিনি বলেন, এসব ইজারাদারদের ইচ্ছামতো চলে। নদীতে এগুলোর দেখার কথা নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শুধু বিআইডব্লিউটিএর ওপর দায় চাপানো উচিত নয়। ৮ বছরে শতাধিক দুর্ঘটনা :গতকালের দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির পর তোলপাড় শুরু হলেও ওই রুটে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে।

গতকাল ২৬ জনসহ গত আট বছরে ওই নৌরুটে অন্তত ৭২ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত বছর ২ নভেম্বর শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে স্পিডবোট ও ফেরির মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ ১৮ যাত্রী আহত হন। নৌপুলিশের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে অন্তত ৭টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। ওই সময় আরও অন্তত ৭০টি দুর্ঘটনা ঘটলেও সবাই প্রাণে রক্ষা পান। এর মধ্যে ওই বছর ১৩ আগস্ট দুর্ঘটনায় ঢাকার মিরপুরের নিখোঁজ দ্বীন ইসলামের সন্ধান মেলেনি আজও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৮ মার্চ শিমুলিয়া ঘাট থেকে মাঝিকান্দি ঘাটে যাওয়ার পথে স্পিডবোট উল্টে গিয়ে ৪ জন নিহত হন। পরের বছর একাধিক স্পিডবোটডুবিতে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট স্পিডবোটডুবিতে যাত্রীরা সাঁতার কেটে তীরে উঠতে সক্ষম হন। এর আগের বছর ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরির সঙ্গে ধাক্কা লেগে স্পিডবোটডুবির পর ১১ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

একই বছর ৩ আগস্ট স্পিডবোটডুবির ঘটনায় ৮ যাত্রী সাঁতার কেটে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও ৪ যাত্রী স্রোতের তোড়ে ভেসে যান। পরে তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ২০১৩ সালের ৩০ মে স্পিডবোটডুবির ঘটনায় ৪ যাত্রী নিখোঁজ হন।

একই সালের ১৮ মে স্পিডবোটডুবিতে ২০ যাত্রী আহত ও ২ যাত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই বছরই ২৪ জুন অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে স্পিডবোটডুবিতে প্রাণে রক্ষা পান ১৫ যাত্রী। ২৯ জুন স্পিডবোটডুবির ঘটনায় ২ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১২ সালের ৮ মে ফেরির ধাক্কায় স্পিডবোট ডুবে এক যাত্রী নিহত ও দুই যাত্রী নিখোঁজ হন।

বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া বন্দর কর্মকর্তা শাহ আলম সমকালকে জানান, নৌরুটে চলাচলরত স্পিডবোটগুলোর কোনো নিবন্ধন নেই। অবৈধভাবেই বছরের পর বছর এগুলো চলাচল করছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে একজন পরিদর্শক এসব স্পিডবোট নিবন্ধন করার জন্য ঘাট এলাকায় অবস্থান নিলেও ইজারাদার ও চালকরা কাগজপত্র দিয়ে সহযোগিতা না করায় নিবন্ধন কার্যক্রম থেমে যায়।

দেশজুড়ে