মতামত



নীলোফার রাজা চৌধুরী

মার্চ / ২৯ / ২০২১


দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী : এক কীর্তিমান পুরুষ


127

Shares

কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক কীর্তিমান ব্যক্তির নাম, যাঁরা সিলেটের ইতিহাসে আপন মহিমায় উজ্জল স্বাক্ষর রেখে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। আমার আব্বা দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী তাঁদের একজন। এখনও তার পরিচয় মাথার ওপর রেখে সম্মানের সঙ্গে চলেছি আমরা ভাইবোনেরা সহ তার অগুনতি গুণমুগ্ধরা।


ষাটের দশকে তিনি তৎকালীন সরকারের সফল শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেওয়ান আব্দুর রব  চৌধুরীর জন্ম ১৯০৯ সালে বালাগঞ্জ থানার গহরপুরের প্রখ্যাত জমিদার বাড়িতে। সারাটি জীবন আব্বা নিজের আদর্শ সমুন্নত রেখেই কাজ করে গেছেন। কখনও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দেশ ও জাতির স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের উপরে রেখে তিনি বৃহত্তর মানবতার কল্যাণ সাধনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ মানুষ তার স্নেহচ্ছায়ায় আশ্রয় পেত। আমাদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল জীবনে যেন নিজেকে কখনও বড় করে না দেখি, বংশ-পরিচয় নিয়ে গর্ব না করি। আমার স্বল্পভাষী, বিনয়ী বাবা ছিলেন আত্মপ্রচারবিমুখ। কখনও কোনো ব্যাপারে তাকে গর্ববোধ করতে দেখিনি।


আমার দাদা দেওয়ান আব্দুল গনি চৌধুরী একজন জনদরদী প্রজাবৎসল জমিদার ছিলেন। প্রতিদিন ভোরবেলা তিনি পায়ে হেঁটে এলাকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজ খবর নিতেন। তার এই প্রজাবৎসল মন তার দুই ছেলে তথা আমার আব্বা দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী এবং আমার চাচা খান বাহাদুর দেওয়ান আব্দুর রহিম  চৌধুরীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে সিলেটের কয়েকটি অঞ্চলে যখন প্রজা বিদ্রোহ প্রকট আকার ধারণ করেছিল আমাদের এলাকা বালাগঞ্জ থানার গহরপুর পরগনায় তা সংক্রমিত হয়নি।


আমার দাদা দেওয়ান আব্দুল গনি চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৬ ও ১৮৮৮ সালে যথাক্রমে এন্ট্রাস (এসএসসি) এবং এফএ (এইচএসসি) পাশ করেন। ‘ল’ কোর্স সমাপ্ত করেন ১৮৯১ সালে। দাদা ছিলেন একজন বিদ্যোৎসাহী এবং সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি। শুধু যে বই পড়তে পছন্দ করতেন তা-ই নয়, বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রচুর বইয়ের বড় সংগ্রহ ছিল তার। শত ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার তদারকি তিনি নিজেই করতেন।


আমার একমাত্র চাচা দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরী সিলেট গভর্নমেন্ট স্কুল এবং সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়ন করেছেন। তিনিও আজীবন শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা এবং সম্প্রসারণে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। নিজ বাড়িতেই


তিনি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের গ্রন্থাদি ছাড়াও সিলেটের ইতিহাস ও তথ্যাদি সম্বলিত বহু দলিলপত্র মজুদ ছিল। তার প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে গহরপুর পোস্টঅফিস ও সুলতানপুর চ্যারিটেবল ডিসপেন্সারি প্রতিষ্ঠিত হয় যা এখনও কালের সাক্ষী বহন করে চলেছে। সড়ক নির্মাণ এবং অনেক জনহিতকর কাজের উদ্যোক্তা তিনি। 


তখনকার সময়ে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলাকায় রিজার্ভ ট্যাঙ্ক নির্মাণ করেন। ১৯২৯ সালে তিনি খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি দীর্ঘদিন সিলেট লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯২১, ১৯২৫ এবং ১৯২৯ সালে পরপর তিনবার তিনি আসাম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। নানান জনহিতকর কাজে ব্যক্তিগত অবদানের জন্য তাকে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক প্রদান করা হয়। ১৯৩৩ সালে তিনিই আসাম মহাজনী আইন সংশোধনী খসড়া তৈরি করেন। ভারতের জামশেদপুরের টাটা কোম্পানির শ্রমিক-মালিক অসন্তোষ চরম পর্যায়ে পৌঁছালে পন্ডিত জওহরলাল নেহরু ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সমন্বয়ে গঠিত সালিশি বোর্ডে তিনি শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারই মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি আয়ত্তে এনে কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে সমর্থ হন। আমার আব্বা দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী স্কুল ও কলেজের পড়াশোনা করেছেন যথাক্রমে সিলেট গভর্নমেন্ট হাই স্কুল এবং এমসি কলেজে। ১৯৩৩ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। 


পিতার মতো পুত্রও ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী। উচ্চশিক্ষার প্রতি তার অভিলাষ ছিল প্রচণ্ড, কিন্তু একমাত্র ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে তাকে সেই আশা ত্যাগ করে অল্প বয়সেই জমিদারির সমস্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। উত্তরসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমার আব্বাও নানা ধরনের উন্নয়নকাজে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি সিলেট লোকাল বোর্ডের সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান এবং চেয়ারম্যান হিসাবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বন্ধুর পথে সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে নিজ দল এবং বিপক্ষ দল সবার সঙ্গেই খুব ভালো সম্পর্ক ছিল তার। সবার কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯৪৬ এবং ১৯৬০ সালে তিনি অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োজিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে আমার দাদা দেওয়ান আব্দুল গনি  চৌধুরী অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৮৯৬ সালে। আমার চাচা দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরী অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৯৩০ সালে। ঐতিহাসিক অসহযোগ (Civil Disobedience) আন্দোলনে আমার আব্বার ভূমিকা ছিল সক্রিয়। আন্দোলনকালে গঠিত Committee of Action-এর চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এই সময় তিনি অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ থেকে ইস্তফা দেন। ১৯৪৬ সালে আব্বা আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৭ সালের সিলেট রেফারেন্ডামে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ১৯৫২ সালে ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে যোগদানকারী চার সদস্য বিশিষ্ঠ প্রতিনিধি দলের তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। ১৯৫৩ সালে সিলেট জেল সংক্রান্ত বিষয়ে গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট স্পেশাল বোর্ডের তিনি ছিলেন মনোনীত সদস্য। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে আমার আব্বা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ও সম্প্রসারণে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আমার দাদা দেওয়ান আব্দুল গনি চৌধুরী শিক্ষার প্রসারের জন্য নিজ গ্রামে যে-পাঠশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (আনুমানিক ১৯১৪ সালে), চাচা খান বাহাদুর দেওয়ান আব্দুর রহিম  চৌধুরী সেটাকে Middle Vernacular স্কুলে উন্নীত করেন। আধুনিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ১৯২১ সালে তিনি নিজ গ্রামে একটি মিডল ইংলিশ (এমই) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এর গুণগত মান ধরে রাখার জন্য বছর দুয়েক তিনি নিজেই এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। চাচার অকাল মৃত্যুতে আব্বা শক্ত হাতে হাল ধরে স্কুলটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘকাল স্কুলটির পুনর্গঠন ও সার্বিক উন্নয়ন সাধনের প্রচেষ্টায় তিনি নিয়োজিত ছিলেন। তারই প্রচেষ্টায় ১৯৫৬ সালে স্কুলটি হাইস্কুলে উন্নীত হয়। ১৯৫৩ সালে দেওয়ান রব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া সিলেট এমসি কলেজ এবং বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও গভর্নিং বডির সদস্য হিসাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মুসলমানদের চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশের পথ তিনি সুগম করে দেন। যুগান্তকারী এই পদক্ষেপের জন্য তাকে বহু সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। 



১৯৫৫ সালে দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী সিলেট মিউনিসিপালিটির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এ-সময় শহরবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন তিনি। ১৯৬২ এবং ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন। মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর সততা, শিষ্ঠাচার এবং আদর্শের নমুনা তখন অনেকেরই মুখে মুখে ছিল। অন্যের মতামত প্রাধান্য দেওয়া ছিল আব্বার আরেকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। 


সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অধিকারী ছিলেন তিনি। কখনও কোনো ব্যাপাওে নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়াটা খুব অপছন্দ করতেন। কি ঘরে কি বাইরেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে অন্যদের পরামর্শ তিনি সক্রিয়ভাবে আমলে নিতেন। সন্তানদের কাছে মা-বাবা সবচাইতে প্রিয়, তা সে-সন্তান যে-বয়সেরই হোক। আমাদের বেলাতেও তা-ই, যার স্মৃতি রোমন্থন করতে এখনও ভালো লাগে।


স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই দেখতাম আব্বা পায়চারি করছেন আমাদের কুমারপাড়া বাসার বারান্দায়, আমাদের অপেক্ষায়। সারাদিনের সব জমানো গল্প বলার জন্য আমরাও অস্থির থাকতাম। আমাদের পাড়ার সব বান্ধবীরা বিকাল হলেই আমাদের বাসায় চলে আসতো। উঠানে আমরা খেলা করতাম। মাঝে মাঝে আব্বা এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন, উৎসাহ দিতেন, শেখাতেন নতুন নতুন জিনিস। যত বড় হয়েছি বুঝতে পেরেছি জীবন চলার পথের রীতিনীতিগুলো আমরা খেলাচ্ছলে কীভাবে শিখে শিখে বড় হয়েছি।


ছুটির দিনে বারান্দার রোদে বসে কত-যে গল্প! আম্মা কমলার ফুল বানিয়ে বানিয়ে আমাদের মুখে দিয়ে দিতেন। সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণ আব্বা বিছানায় হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে তসবিহ পড়তেন। আমরা বোনেরা দু’পাশে পা উঠিয়ে বসতাম। আব্বার তসবিহ পড়া শেষ হলে সবাইকে পালা করে একেকটা গল্প বলতে হতো। মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি। আব্বাও করতেন। সেইসব স্মৃতি আজও মনে পড়ে।


আমি এবং আমার বোনেরা একজনের পর

আরেকজন গার্লস গাইডের লিডারশিপ দিয়ে এসেছি বছরের পর বছর। আব্বা এতে প্রচুর উৎসাহ যোগাতেন। বেকিং, কার্ভিং বা অনেক ধরনের সৃজনশীল কাজ ছিল আমাদের পরিবারের বৈশিষ্ট্য। যদিও আমরা এগুলো আম্মার কাছ থেকেই শিখেছি কিন্তু এতে প্রচণ্ড উৎসাহ যোগাতেন আব্বা। প্রয়োজনে সময় বের করে পাশে বসে থাকতেন। সবকিছুতে এত উৎসাহ জানি না ক’টা মেয়ের ভাগ্যে জোটে। আব্বার বিশ্বাস ছিল শুধু শাসনে কখনও সন্তান মানুষ করা যায় না। তাই হয়তো উচ্চস্বরে কথা বলার কোনো প্রথা আমাদের বাসায় ছিল না। আব্বা আমাদের সবচাইতে কাছের মানুষ, সবচাইতে আপনজন, সবচাইতে প্রিয় বন্ধু ছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের এক তারিখ ছিল তাঁর ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। তোমায় প্রচণ্ড মিস করি আব্বা!

মতামত