সিলেট প্রতিক্ষণ



দেশদর্পণ ডেস্ক

মে / ০৪ / ২০২১


বিধিনিষেধ

বিধিনিষেধ থাকলেও শঙ্কা ঈদ নিয়ে


61

Shares

প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার চলমান বিধিনিষেধের মেয়াদ আরও বাড়ানোয় এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরও পড়ছে লকডাউনের মধ্যে। তবে মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহন আংশিক চালুসহ কিছু কড়াকড়ি শিথিল করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে ঈদকে ঘিরে শঙ্কা কিছু কমলেও একেবারে দূর হয়নি। তাই সরকারকে ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখন অনেকটাই নিম্নমুখী। শনাক্তের হার ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

চলমান বিধিনিষেধের কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে- এটি প্রমাণিত। সুতরাং ঈদের আগে আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না সরকার। এ কারণে চলমান বিধিনিষেধ আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দোকানপাট ও শপিংমলের পর এবার গণপরিবহনও সীমিত পরিসরে চালু করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে জেলার মধ্যে গণপরিবহন চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে গাদাগাদি করে ঘরে ফেরার দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত।

দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ রাখলেও মানুষের গ্রামে ফেরা কতটুকু আটকানো যাবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, গত বছরের ঈদযাত্রার ইতিহাস সুখকর নয়। সে সময় দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ রেখেও মানুষের গ্রামে ফেরা আটকানো যায়নি। প্রাইভেটকার, পিকআপ ভ্যানসহ বিকল্প পথে হাজার হাজার মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরী থেকে গ্রামে যাতায়াত করেন। ওই ঈদযাত্রার পর গত বছরের জুন-জুলাই মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছিল ব্যাপক হারে।

এ কারণে এবারের ঈদ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। এর মধ্যে ভয় জাগাচ্ছে করোনার ভারতীয় নতুন ধরন। প্রতিবেশী বাংলাদেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ঈদযাত্রায় কঠোর নজরদারি না করলে বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

তাদের অভিমত, ভারতে সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তা অত্যন্ত আতঙ্কের। তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ওই সংক্রমণ বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকেও কঠোর নজরদারির ইঙ্গিত মিলেছে।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ঈদের দিন ও আগে-পরে দু'দিনসহ মোট তিন দিনের বেশি ছুটি দেওয়া হবে না। আগামী ১৪ মে ঈদ হতে পারে। কাজেই ঈদের ছুটি হবে তিন দিন, এর মধ্যে শুক্র ও শনিবারও রয়েছে। পোশাক ও অন্যান্য শিল্পকারখানাও এ সময়ের বেশি ছুটি দিতে পারবে না। তিনি বলেছেন, সরকারি বেসরকারি অফিস-কারখানা যেগুলো যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। ঈদযাত্রা নিয়ে এবারও শঙ্কা: গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতসহ গণপরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ক্রমেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। প্রথমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মাদারীপুর থেকে ধাপে ধাপে বিস্তার ঘটিয়ে সারাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের মে মাসের শেষের দিকে ঈদের ছুটির পর জুন-জুলাই মাসে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ জন্য ঈদযাত্রাকেও দায়ী করা হয়। গত বছরও দূরপাল্লার পরিবহন, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকার পরও মানুষের ঈদযাত্রা ঠেকানো যায়নি।

অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, পিকআপভ্যান ভাড়া করে বিকল্প পথে গ্রামে ছুটেছিলেন লাখো মানুষ। এরপর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামেও। এবারও ঈদযাত্রা ঠেকাতে দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ রাখা হচ্ছে। এবার জেলার মধ্যে পরিবহনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানুষ ভেঙে ভেঙে গ্রামে ফিরতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন মানুষ হয়তো ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাবেন। তিনি ঢাকা জেলার অভ্যন্তরীণ পরিবহনে করে সাইনবোর্ড পর্যন্ত গেলেন। পরে সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী হয়ে ভেঙে ভেঙে চট্টগ্রামে পৌঁছাবেন। এভাবে হাজার হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেতে চাইলে সড়কে ভিড় বাড়বে।

এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সুতরাং এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যথায় দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ রেখেও কোনো সুফল আসবে না। ভয় জাগাচ্ছে ভারতীয় ধরন: দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের পর এবার ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরন ভয় জাগাচ্ছে। কারণ, গত কয়েক দিনে নতুন ধরনের সংক্রমণে ভারত বিপর্যয়ে পড়েছে। এ ধরনটি অধিক সংক্রমণপ্রবণ। আগের ধরনের তুলনায় এটি দ্রুত মানুষকে আক্রান্ত করে। একই সঙ্গে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং বেশি সংখ্যায় মৃত্যু ঘটায়। ভারতে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটি দেশে শনাক্ত হয়েছে। জানা গেছে, এপ্রিলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর অধিকাংশ দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনে সংক্রমিত ছিলেন। এখনও যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা এ দুই দেশের ধরনে সংক্রমিত। সুতরাং ভারতীয় ধরন যে কোনো সময় বাংলাদেশে আসবে। এরই মধ্যে হয়তো চলেও এসেছে।

ওই ধরন এলে তা অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। ঈদ সামনে রেখে হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে গ্রামে ফিরে যাবেন, আবার নগরীতে ফিরে আসবেন। এতে আসন্ন জুন-জুলাই মাসে করোনার তৃতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঈদযাত্রায় লাগাম টানা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ভারতীয় ধরন বাংলাদেশে এসেছে কিনা, তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কঠোর নজরদারি চান বিশেষজ্ঞরা :ঈদযাত্রায় কঠোর নজরদারি না করলে সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

তিনি সমকালকে বলেন, গত বছরের ঈদযাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই সময় গণপরিবহন বন্ধ ছিল। কিন্তু বিকল্প পথে প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও পিকআপভ্যান ভাড়া করে গ্রামে ফিরেছিল। ওই সব মানুষ ঈদ শেষে আবার ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীতে ফিরে আসে। এরপরই সারাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং জুন মাসে ভয়াবহ পরিস্থিতি ধারণ করে। জুলাই মাসে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছিল। এবারও সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

সুতরাং এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঈদযাত্রায় বিধিনিষেধ পালনে শিথিলতা দেখালে বিপদ হবে। ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, জীবন ও জীবিকার তাগিদে চলমান বিধিনিষেধ অনির্দিষ্টকাল অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। কারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ অধিকাংশ মানুষ এতে করে বেকার হয়ে পড়বে। অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসতে পারে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই ঈদের পর সবকিছু খুলে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষ করে শতভাগ মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ঈদ উৎসবের মতো বড় জমায়েতের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলে সংক্রমণ কমে আসবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, আগে থেকে বলে আসছি, করোনার একটি ধাপের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৪ দিন বিধিনিষেধ বা লকডাউন কার্যকর রাখতে হবে। দুই ধাপের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তা ২৮ দিন হবে। এটি বিজ্ঞানসম্মত। সে হিসাবে চলমান বিধিনিষেধ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে বিধিনিষেধ শিথিল করলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে অধিক সংক্রামক ভারতীয় নতুন ধরন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, সরকারের বিধিনিষেধ আরোপের ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসছে। এটি বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। সুতরাং সরকারের লক্ষ্য সংক্রমণ ও মৃত্যু কমিয়ে আনা। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত ঈদযাত্রা নিরুৎসাহিত করা। এ জন্য প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, চলমান বিধিনিষেধের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও কিছু কিছু বিষয়ে শিথিলতা দেখানো হয়েছে। সরকার জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকার অবশ্যই কঠোর হবে।


সিলেট প্রতিক্ষণ