দেশদর্পণ ডেস্ক

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ




১৪ ফেব্রুয়ারির রাজনৈতিক অর্থনীতি

মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া 
চারদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারির ডামাডোল। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দেখলাম ‘এসেছে ভালোবাসার উৎসব’ স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছে এবং দিসবটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিপণীবিতানগুলোও থেমে নেই। একটা ভালো বিক্রিবাট্টার আশায় সম্ভব সবধরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানুষের ভালোবাসা দিবস বলে কথা! নিরাপত্তার ঘাটতি যেন না হয়, প্রশাসনও সেই কর্মপরিকল্পনায় ব্যস্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি এবং পড়াই বলেই জানি ১৪ই ফেব্রুয়ারি কতটা আবেদনময়ী! ঠিক সরকারি বন্ধ না থাকলেও অনানুষ্ঠানিক বন্ধের প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়ে যেতে হয় কারণ ছাত্ররা নিজেদের জন্য ‘একটা দিনই তো’ চেয়েছে।

ইদানিং অবশ্য ক্যাম্পাসগুলোতে ভালোবাসা দিবসে কয়েক শ্রেণীর মানুষের দেখা মিলে। যাদের ভালোবাসা আছে, যারা পাওয়ার নেশায় সম্ভব সব পথের অনুসন্ধানে উন্মুখ কিংবা ‘সিঙ্গেল’ হিসেবে ভালো আছে তা বুঝাতে রীতিমতো লুঙ্গি মিছিল করছে। আবার কিছু মানুষকে দেখি, হতাশার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ফেসবুকে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে হরতাল ঘোষণা দেওয়ার জন্য ইভেন্ট খুলে বসেছে।

মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে, এতে সুন্দর বৈ অসুন্দরের কিছু নেই। আমারও তাতে কোন আপত্তি নেই। এমনিতেই বাঙালি জীবনে স্বতস্ফুর্ত উৎসবমুখরতা যেন দিন দিন প্রাণ হারাচ্ছে তার মধ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি যদি প্রাণসঞ্চার করে তাতে ক্ষতিইবা কি?

আমার যে ছাত্রকে খুব কম সময়ই চুল সুবিন্যস্ত পাই, তাকেও দেখি কি সুন্দর পরিপাটি করে নিজেকে নিয়ে আসে ভালোবাসার এই উৎসবে, ভালোই লাগে আমার। একটা বিষয় এখানে বলে রাখা দরকার পহেলা বৈশাখ পালনের আনুষ্ঠানিকতায় এদেশের কিছু মানুষের জোরালো আপত্তি থাকলেও ১৪ ফেব্রুয়ারির বিষয়ে তাদের খুব আপত্তি আছে বলে মনে হয় না। এইখানেই ১৪ ফেব্রুয়ারির ‘মাহত্ম’। এটাতে ধর্মও নাই, রাজনীতিও নাই। একটা ক্লাসে আমার ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাস করেছিলাম, ১৪ ফেব্রুয়ারি কি দিবস এবং কেন? উত্তরটা যে আমাকে খুব নিরাশ করেছে তা বলবো না কারণ উত্তর আমার অনুমানযোগ্যই ছিল। দিবসের কারণ সম্পর্কে ভিন্ন মতামত আসলেও প্রায় শতভাগই দিবসটিকে ভালোবাসা দিবস হিসাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিল।

শতভাগ বলছি কারণ দুইজন ছিলো যারা দিবসটিকে ভালোবাসা দিবস ছাড়াও অন্য একটা দিবস হিসাবে নামকরণ করার চেষ্টা করেছিল। ঠিক সঠিক মনে নেই, একজন বলেছিল- এরশাদ শাসন বিরোধী দিবস। আরেকজন সম্ভবত বলেছিল এরশাদের শিক্ষানীতি বিরোধী দিবস। যদিও প্রকৃত ঘটনা কি ছিল, সেই বিষয়ে খুব একটা পরিস্কার জবাব দিতে পারেনি। আমি যখন বললাম, এটা ছিল স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, যেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দাবি ছিল। বললাম, এটা হলো স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। জিজ্ঞাস করলাম, তোমরা কেউ কি শহীদ জয়নাল, আইয়ূব, দীপালীকে চেনো? তোমরা জি জানো মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি বাতিলের সংগ্রামে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের কচি কচি চেহারার ছোট্ট চাহনিতেই পরিস্কার ছিল, এসবের কিছুই তারা জানে না। এই যে না জানা, তার পেছনে কি কোন রাজনীতি আছে? ভালোবাসা দিবসকে প্রধান করে তোলার পেছনে কি কোন অর্থনীতি জড়িত আছে? ’৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া তথাকথিত গণতান্ত্রিক দলগুলোই তো ’৯০ পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল। তাহলে তারা কেন সযতেœ সংগ্রামী এই দিনটিকে উদযাপন করার বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছে কিংবা কেন এই বিষয়টিকে পাদপ্রদীপের নিচে নিয়ে আসেনি?

রাজনীতি এখানেই, গণতান্ত্রিক সংগ্রামী চেতনাকে যত ভুলিয়ে রাখা যায় ততই মঙ্গল, তাতে শোষণ শাসনের যাতাকল অব্যাহত রাখা যায় এবং প্রতিবাদহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করা যায়, দিনশেষে যে এটি ধনতান্ত্রিক মুষ্টিমেয় শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এতো ছিল রাজনৈতিক ব্যাপার, অর্থনৈতিক লাভটাও কিছু কম নয়। কোন একটা লেখায় পড়েছিলাম শুধু ১৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক প্রায় ২০০ কোটি টাকার উপর অর্থনৈতিক লেনদেন হয় যার, পুরোটাই অর্থনৈতিক ভাষায় অফলা।

তাই যত বেশি ভালবাসা দিবসের আয়োজন তত বেশি মুনাফা লাভের সুনিশ্চিত ব্যবস্থা। তাই দিন যত যাচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস আয়োজনের অবয়ব বাড়ছে আর চকচক করছে পুঁজিতন্ত্রের হাত পা মাথা। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের একটা কথা আছেÑ ‘ইতিহাস আমরা তৈরি করি না বরং ইতিহাসই আমাদের তৈরি করে।’ ভাববার সময় সময় এসেছে ইতিহাস কি এইভাবে আমাদের তৈরি করেছে? আর যদিও ধরে নেই আমরা ইতিহাস তৈরি করি তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সঠিক ইতিহাস তৈরি করছি? গণতান্ত্রিক সংগ্রামী মানুষের এই যে সংস্কৃতিক পরাজয় তার দায়ভার কিছুটা কি আমাদেরও নয়?

লেখক- সহকারী অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়