দেশদর্পণ ডেস্ক

২৩ মার্চ ২০১৮, ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ




হলি আর্টিজান হামলার অস্ত্র ও অর্থ জোগানদাতা সাগর ও নিলয়

দেশদর্পণ ডেস্ক :: গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার অন্যতম সমন্বয়ক, অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা এবং ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনাকারী নব্য জেএমবির শীর্ষ দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। বৃহস্পতিবার ভোরে বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার কিচক এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো হাদিসুর রহমান সাগর ওরফে জুলফিকার ওরফে তৌফিক (৩৬) ও আকরাম হোসেন খান নিলয় (২৪)। তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে হাদিসুর রহমান সাগর জয়পুরহাটের সদর থানার কয়রাপাড়া পলিকাদোয়া গ্রামের হারুন অর রশিদের পুত্র এবং আকরাম হোসেন খান নিলয় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার চারিগ্রামের আবু তোরাব খানের পুত্র। এর মধ্যে হাদিসুর রহমান সাগরকে সাত ও নিলয়কে ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া হাদিসুর রহমান সাগর গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার অন্যতম সমন্বয়ক ও অস্ত্রের জোগানদাতা। আর নব্য জেএমবি ও গুলশান হামলার অর্থদাতা এবং মূল সমন্বয়ক ও পান্থপথে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হলো আকরাম হোসেন খান নিলয়। তারা দুজনই গুলশান হামলার ঘটনায় অন্যতম আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন পলাতক ছিল।

গত বছর ১৫ আগস্ট রাজধানীর কলাবাগানে জাতীয় শোক দিবসের শোকযাত্রায় হামলার মূল পরিকল্পনা করেছিল নিলয়। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে নিলয়ের বাবা আবু তোরাব, মা ও বোনকে ওই হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল সিটিটিসি। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছে। হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে বিস্ফোরক সরবরাহের অর্থের জোগানদাতা ছিল নিলয় ও তার পরিবার। পান্থপথের ওই হোটেলে বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগ বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসিকে জানিয়েছে, পান্থপথে শোক দিবসে হামলার জন্য সংরক্ষণ করা বোমাটি নিলয়ের নির্দেশে তৈরি করেছিল জঙ্গি মামুন। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর মামুনকেও রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে তানভির ইয়াসিন করিম নামে নিলয়ের আরেক বন্ধুকে গত বছরের ২০ নভেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। ওই তানভির নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করতে নিলয়কে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিল বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছে। তানভির ছাড়াও নিলয়ের ঘনিষ্ঠ আরো অনেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। নিলয় সম্পর্কে আরো জানা গেছে, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে শীর্ষ জঙ্গি নেতারা নিহত হলে নিলয় নব্য জেএমবির হাল ধরে আবার নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টায় ছিল। নিলয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র। সে নব্য জেএমবিতে ‘স্লেড উইলসন ও জ্যাক স্পেরো’ নামেও পরিচিত ছিল।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৬ সালে গুলশান হামলার পরও নব্য জেএমবির কার্যক্রম থেমে থাকেনি। নিলয়ের নেতৃত্বে নব্য জেএমবি ১৫ আগস্টে জাতীয় শোক দিবসে হামলার প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী, এমপিসহ শতাধিক মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। সেদিন মূলত তাদের টার্গেট ছিল ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর।

ওই দিন সকালে হামলার আগেই সিটিটিসির অভিযানে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের একটি কক্ষে নিজেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় জঙ্গি সাইফুল। ওই ঘটনায় রাজধানীর কলাবাগান থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। ওই মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এই ঘটনার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। কারা, কেন এবং কী উদ্দেশে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল, তা জানা গেছে। এমনকি কারা অর্থ সরবরাহ করেছিল, তাও জানা গেছে। এরই মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। খুব শিগগির আমরা আদালতে চার্জশিট দিয়ে দেব।’

সাগর আরো ভয়ংকর : বগুড়ায় গ্রেপ্তার হওয়া মাঝারি মানের শিক্ষিত সাগর পুরনো জেএমবির সদস্য ছিল। সে ২০১৪-১৫ সালে তামিম চৌধুরীর হাত ধরে নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়ে বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করছিল। একপর্যায়ে নব্য জেএমবির শুরা সদস্য মনোনীত হয় সে। নব্য জেএমবিতে তার মূল দায়িত্ব ছিল উত্তরাঞ্চলে। ভারতের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক সরবরাহের কাজ করত সে। গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো রাশেদ ও ছোট মিজানের কাছে দেয় সাগর। গুলশান হামলার ঘটনায় অন্যদের সঙ্গে সেও অস্ত্র, বিস্ফোরক সরবরাহ করেছিল। কয়েক মাস আগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলা থেকে তার স্ত্রীকেও আটক করে পুলিশ।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, সাগরকে তারা হন্যে হয়ে খুঁজছিল। গুলশান হামলার পর থেকে সে পলাতক ছিল। এর আগে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে সাগরের ব্যাপারে বিস্তর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

সূত্র মতে, সাগরের আসল নাম হাদিসুর রহমান। সাগর তার সাংগঠনিক নাম। সাগর গুলশান হামলার আরেক সংগঠক নূরুল ইসলাম মারজানের ভগ্নিপতি। মারজান এর আগে গ্রেপ্তার হয়। মারজানের বাড়ি পাবনায় হলেও সাগর ও সে একসময় কুষ্টিয়ার সীমান্ত এলাকায় থাকত। এই সুবাদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও ঝিনাইদহে তাদের যাতায়াত ছিল। গুলশান হামলার আগে ঝিনাইদহে থাকা জঙ্গিদের আস্তানায় সাগর গিয়েছিল। সাগর অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। ধরা পড়ার আগে সে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করত জানিয়ে সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, সাগর যোগাযোগ রক্ষায় ইন্টারনেট অ্যাপস ব্যবহারেও বিশ্বাসী নয়। সরাসরি যোগাযোগ করে সাংগঠনিক কাজ করত। সাগরের ঘনিষ্ঠ অনেকে সাবেক শিবিরকর্মী।

এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া রাজীব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ ও রাশেদ র‌্যাশের রিমান্ডে দেওয়া তথ্য মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যায় জড়িত খালিদের হাত ধরে নব্য জেএমবিতে আসে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ। সে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, রাজশাহীতে সাগরের সহযোগী হিসেবে যারা জেএমবিতে এসেছে তাদের অনেকে আগে শিবিরকর্মী ছিল।

গুলশান হামলার চার্জশিটভুক্ত দুজন এখনো পলাতক রয়েছে। রাজশাহীর এই দুই শীর্ষ জঙ্গির নাম মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, গুলশান হামলার আগেই ভারতে পালিয়ে গেছে তারা। এই দুজন উত্তরাঞ্চলে দুই ডজন হত্যা ও হামলার পরিকল্পনাকারী।

সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তার করা সাগর ও নিলয়কে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা মোবাইল ফোনে প্রাথমিক পর্যালোচনায় জঙ্গিসংশ্লিষ্ট গোপন যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র: কলের কন্ঠ

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর