সোশ্যাল মিডিয়া



দেশদর্পণ ডেস্ক

১৯ নভেম্বর ২০১৭, ৭:১০ পূর্বাহ্ণ




হইয়া আমি দেশান্তরি পর্ব-০১

লুৎফর রহমান রিটন

টোকিও দূতাবাসে আমার অফিস কক্ষ। ২০০১ এর মধ্য জুন।
টোকিও শহরের মেগুরু কু নামের একটা আবাসিক এলাকায় ছিলো বাংলাদেশ দূতাবাসের অদ্ভুত ভবনটা। পাশাপাশি দুটি বাড়ি। দুটোর প্রবেশ পথ আলাদা। একটায় বসেন রাষ্ট্রদূত আরেকটায় কয়েকজন কর্মকর্তাসহ দাপ্তরিক কর্মচারীরা। রাষ্ট্রদূত বসেন দোতলায়, তার নিচ তলায় হল রুম। দ্বিতীয় ভবনের দোতলায় বসি আমিসহ আরো তিন কর্মকর্তা। একাউন্টস সেকশনটি এই ভবনেই। পাসপোর্ট নবায়নসহ অন্যান্য সেবাদানের জন্যে নিয়োজিত কর্মীরা বসেন আমাদের নিচতলায়। আমাদের ভবনের ব্যাক ইয়ার্ড দিয়ে রাষ্ট্রদূতের ভবনে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ কী না পেছন দরোজা দিয়েই আমরা যাতায়াত করতাম। রাষ্ট্রদূতের নাম ছিলো জামিল মজিদ।

দূতাবাসে আমার এই নিয়োগটা ছিলো এমন একটা সময়ে যার কয়েকমাস পরেই নির্বাচন। শুভাকাঙ্খী নিকটজনেরা বারণ করেছিলেন। এরকম একটা সময়ে ওরকম একটা দায়িত্ব নেয়াটা বোকামি হবে। এক দুপুরে দৈনিক জনকণ্ঠ অফিসে মুসা ভাই (এবিএম মুসা) বললেন, এই সময়ে তোমার যাওয়াটা ঠিক হবে না। কয়েকদিন পরেই ইলেকশন। তোমার নেত্রী হেরে গেলে, আওয়ামী লীগ হেরে গেলে বিএনপি জামায়াত তো তোমার চাকরি সঙ্গে সঙ্গেই নট করে দেবে। তোমাকে আবার ফিরে আসতে হবে বাংলাদেশে।
আমি বলেছিলাম, মুসা ভাই আমি কি চিরকালের জন্যে যাচ্ছি নাকি চাকরি নিয়ে? ইলেকশনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে আমার চাকরি থাকবে না সেতো জানা কথা। সুতরাং আমাকে কয়েক মাস পরে দেশে ব্যাক করালে তাতে আমার মান সম্মান খোয়া যাবে না মুসা ভাই। আমি তো দেশেই থাকতে চাই।
তখনও জানতাম না নিয়তি আমাকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে!

১০ অক্টোবরের নির্বাচনে ‘বিএনপি-জামায়াত জোট’ সরকার গঠন করার প্রথমদিনেই সচিবসহ ১৮ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিলো। পত্রিকায় প্রকাশিত সেই তালিকার ১৮ নম্বর নামটি ছিলো আমার। আমিই ছিলাম একমাত্র, যিনি বাংলাদেশের বাইরে দায়িত্বপ্রাপ্ত। বাকি ১৭ জনই ছিলেন বাংলাদেশে কর্মরত।

সাধারণত দেশের বাইরে কোনো দূতাবাসে কর্মরত কাউকে চাকরি থেকে সরাতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘কল ব্যাক’ করা হয়। তিনি কিছুদিন সময় পান। আমার ক্ষেত্রে সেই নিয়ম পালন করা হয়নি। আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিলো ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ টাইপের ঘটনা। ঘটনাটা ‘একটি বিরল ঘটনা’ হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলো। ফলে, বিদেশের মাটিতে বেতন-ভাতাহীন অবস্থায় আমাকে কাটাতে হয়েছিলো ভয়ঙ্কর চার চারটি মাস। এরকম ঘোরতর অন্যায় কাজটি সম্পন্ন হয়েছিলো একমাত্র একজনের বেলায়, সেটা আমি। সেই সময়ের হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীতে দ্বিতীয় ব্যয়বহুল বা খরুচে শহরটি ছিলো টোকিও। প্রথম শহরটি ছিলো জুরিখ। টোকিওর মতো খরুচে শহরে বেতন-ভাতাহীন একজন ডিপ্লোম্যাটকে পরিবার নিয়ে কী দুর্ভোগের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিলো সেই কাহিনী আজও লেখা হয়নি। অথচ লেখা উচিৎ আমার। ভাবছি লিখবো সেটা পর্যায়ক্রমে।

দুই.
সরকার বদলের পর পৃথিবীর নানা দেশের দূতাবাসে অবস্থানরত ও কর্মরতরা অনেকেই চটজলদি নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন কিন্তু আমি তা করিনি। উলটো, তথ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে আমাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছিলাম। তখন টোকিও থেকে প্রবীর বিকাশ সরকারের সম্পাদনায় ‘মানচিত্র’ নামে সুমুদ্রিত একটা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। তাতে আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো আরিফ মাসুদ। সেই সাক্ষাৎকারেও আমি দূতাবাসে আর কাজ করতে না চাওয়ার বিষয়টি খোলামেলা ভাবে অকপটে জানিয়ে দিয়েছিলাম। সম্পাদক প্রবীর আমার যে ভাষ্যটিকে সাক্ষাৎকারের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন সেটা ছিলো ”নিজামী যে সরকারের মন্ত্রী সেই সরকারের অধীনে আমি কাজ করতে চাই না”।
আমার লেখক পরিচয়টি ডিপ্লোম্যাট পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি সম্মান ও মর্যাদার সেটা আমি কখনোই বিস্মৃত হইনি।

তিন.
বাংলা-বাঙালি-বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে লেখালেখির কারণে, একাত্তরের ঘাতক দালাল রাজাকারদের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে, স্বৈরাচার ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির কারণে আমার প্রতি জামায়াত ও বিএনপির ক্ষোভ ও আক্রোশ কোনো পুরনো বিষয় ছিলো না। উপরন্তু ৯৬ সালে ‘জনতার মঞ্চ’ নামের যে সমাবেশ বিএনপির পতন ঘটিয়েছিলো সেই জনতার মঞ্চে আমি ছিলাম এক দৃশ্যমান কুশীলব। আমার নেপথ্য ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ। সুতরাং বিএনপি-জামাত রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহন করেই আমার প্রতি আগ্রাসী হবে, প্রতিশোধ পরায়ন হবে সেটাই স্বাভাবিক। আর তাই তৎকালীন সরকার আমাকে ভাতে মারতে চেয়েছে। পানিতে মারতে চেয়েছে। চারটি মাস আমাকে একটি পয়সাও না দিয়ে, দেশে ফেরার টিকিট না দিয়ে বলতে গেলে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো টোকিওর মতো ব্যয়বহুল একটি নগরীতে।

আমি তখন টের পেয়েছি রাজনীতি কি। সরকার কি। ডিপ্লোম্যাট বা সরকারি কর্মকর্তা কি। চেতনা কি। আদর্শ কি। ইতিহাস কি। মুক্তিযুদ্ধ কি। স্বাধীনতা কি। লেখক কি এবং লেখালেখি কি।

সেই সময়ে, টোকিওতে যাপিত আমার দুঃসহ দিনগুলোকে অনুভব করে সাংবাদিক আবেদ খান কলাম লিখলেন জনকণ্ঠের প্রথম পাতায়। সেখানে তিনি আশংকা প্রকাশ করলেন, ‘স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে বেতন-ভাতাহীন রিটন অনাহারে থাকবে। একসময় হয়তো আত্মহত্যা করবে…!’ ভোরের কাগজের প্রথম পাতায় মুনতাসীর মামুন কলাম লিখলেন। শিরোনাম-‘লাশ পড়ে থাকবে টোকিওর রাস্তায়, সো হোয়াট?’
না। আমার লাশ পড়ে থাকেনি টোকিওর রাস্তায়। কিংবা আমি আত্মহত্যাও করিনি। কোনো আপোস করিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে আজও বেঁচে আছি আমি। সে এক দীর্ঘ গল্প। সেই গল্পের সামান্য ছিটেফোঁটা আজকের এই লেখা।

একটা পুরনো ছবি হাতে এলো হঠাৎ করেই। ছবিতে, আমি বসে আছি টোকিও দূতাবাসে, আমার অফিস কক্ষে। ছবিটা দেখেই এক সঙ্গে বহু স্মৃতি এসে জাপটে ধরলো আমাকে। আহা কী দিনগুলোই না পার করে এসেছি আমি!

চার.
প্রতিদিন সকাল ১১টায় রাষ্ট্রদূতের কক্ষে আমরা কয়েকজন ‘ডিপ্লোম্যাট’ বসি। ফার্স্ট সেক্রেটারি রাব্বানী, সেকেন্ড সেক্রেটারি দাউদ আলী, ইআরডি থেকে আগত আবদুল কাদের, কমার্শিয়াল কাউন্সিলর হোসেন আহমেদ আর আমি, ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস। এটা অনানুষ্ঠানিক চা-বৈঠক, প্রাত্যহিক।

২০০১-এর ইলেকশনের পরের দিন সকালে যথারীতি সেইরকম একটা বৈঠকে বসেছি। ইলেকশনে আওয়ামী লীগ হেরে গেছে। জামায়াত-বিএনপি জোট এখন সরকার গঠন করবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।

রাষ্ট্রদূত জামিল মজিদ বললেন, যা-ই বলেন না কেনো, খালেদা জিয়ার মধ্যে কিন্তু একটা স্টেটসম্যানশীপ ব্যাপার আছে।
রব্বানী দাউদরা সঙ্গে সঙ্গে সহমত পোষণ করে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ স্যার জ্বি স্যার।
আমি সরাসরি তাকালাম জামিল মজিদের দিকে। বললাম, গত পরশু পর্যন্ত কিন্তু এই স্টেটসম্যানশীপ ব্যাপারটা আপনি শেখ হাসিনার মধ্যে দেখতে পেতেন! ইলেকশনের রেজাল্টের সঙ্গে সঙ্গেই আপনার বিবেচনা বোধও দেখি একেবারেই বিপরীত দিকে টার্ণ নিয়েছে স্যার!
আমার এরকম আচমকা দাবড়ানিতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন জামিল মজিদ সাহেব। বৈদ্যুতিক শক খাওয়া মানুষের মতো পলকহীন বিস্ময়নেত্রে তিনি তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে। আর আমার সহকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন কেউ ছাদের সৌন্দর্য অবলোকনে, কেউ জানলা ঠেলে দৃষ্টি গলিয়ে দেন বাইরে আর কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন টেবিলে অযত্নে পড়ে থাকা পুরনো ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদপট। হাহ হাহ হাহ…

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর