লিড নিউজ, সিলেট প্রতিক্ষণ



দেশদর্পণ ডেস্ক

১৯ মার্চ ২০১৮, ১২:০৯ অপরাহ্ণ




শহীদ হতে চেয়েছিল জঙ্গি ফয়জুল

নেসারুল হক খোকন ও ইয়াহ্ইয়া মারুফ :: জনপ্রিয় লেখক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যা করে নিজেও শহীদ হতে চেয়েছিল ফয়জুল। তবে ফয়জুলের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। হামলার ৩-৪ মাস আগে সিলেট নগরীর আলহামরা শপিং সেন্টার থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে চাকু কিনেছিল ফয়জুল তা দিয়েই জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায়।

বিশ্বের আলোচিত জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তার কোনো যোগসূত্রতা নেই। যোগাযোগ ছিল না আল কায়দা বা অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও। জাফর ইকবালের লেখা শিশুতোষ বই ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ বইটি জঙ্গি হামলায় নিহত অভিজিতের নামে উৎসর্গ করায় তাকে (জাফর ইকবাল) নাস্তিক হিসেবেই ধরে নিয়েছিল ফয়জুল। আদালতে এমন চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুল হাসান। রোববার সিলেট মেট্রোপলিটন আদালত-৩-এর বিচারক হরিদাস কুমার তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ফয়জুল হাসানের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এ বিষয়ে যুগান্তরকে জানায়, ফয়জুল প্রথমে দিরাই উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করলেও পরে আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সিলেটে থাকাবস্থায় কুয়েত প্রবাসী চাচা সাদিকুর রহমানের মাধ্যমে আহলে হাদিসে দীক্ষা নেয়। কিন্তু অর্থাভাবে লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি।

এক সময় আম্বরখানায় স্বল্প বেতনে একটি কোরআন রিসার্চ সেন্টারে কাজ নেয়। সেখানেই পরিচয় হয় আরেক যুবকের সঙ্গে। তার নাম প্রকাশ করতে চাননি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে সে এখন গোয়েন্দা পুলিশের কব্জায়। ওই যুবক ফয়জুল হাসানকে একটি মেমোরি কার্ড দিয়ে নাস্তিকদের হত্যা করা নিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করে। ওই মেমোরিতে রহমানিয়া হুজুরসহ জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের লেখা বই ছিল। সেখানে মিয়ানমার ও ফিলিস্তিনসহ মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের নানা ভিডিও ক্লিপিং ছিল।

এগুলো দেখেই ফয়জুলের মধ্যে প্রতিশোধ নেয়ার আগ্রহ জেগে ওঠে। রহমানিয়া হুজুরের লেখা ‘উন্মুক্ত তরবারি’ বইয়ের একটি লাইনে জিহাদের উদ্ধৃতি দেয়া হয়। সেখান থেকেই জাফর ইকবালকে হত্যার পরিকল্পনা করে ফয়জুল। ঘটনার দিন ৩ মার্চ সকাল ১০টার দিকে একবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড. জাফর ইকবালকে দেখতে পায়।

তখন ড. জাফর ইকবাল হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে ফিরে আসে। এর আগে সেখানে এক শিক্ষার্থীর কাছে জাফর ইকবাল কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করে রোবটিং প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জানতে পারে। বেলা ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে রোবটিং প্রতিযোগিতা দেখার অভিনয় করে আবারও যায়। এরপর সেখানে গিয়েই সে ড. জাফর ইকবালকে মঞ্চে বসে থাকতে দেখে। অন্য লোকজনের মাঝে নিজেকে আড়াল করে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে ড. জাফর ইকবালের ওপর চাকু দিয়ে হামলা চালায়।

জবানবন্দিতে ফয়জুল জানিয়েছে, সে ভেবেছিল হামলার পর তাকে হত্যা করা হবে। এ সুযোগে সে শহীদের মর্যাদা পেয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মারধরে মৃত্যু (শহীদ) না হওয়ায় তার আফসোসেরও শেষ নেই।

এদিকে ফয়জুলের বাবা হাফিজ আতিকুর রহমান, মা মিনারা বেগম, মামা সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুর রহমান ও ভাই এনামুল হকের বিরুদ্ধে আলামত নষ্ট করার অভিযোগ পায় পুলিশ। সে কারণেই তাদের এ মামলায় আটক করা হয়। জব্দকৃত ট্যাবে গুরুত্বপূর্ণ আলামত পেয়েছে পুলিশ। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা জানান তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য ভূষণ চৌধুরী বলেন, ফয়জুল কীভাবে হামলা করেছে, হামলার পরিকল্পনা কতদিন ধরে করেছে, তার সঙ্গে কেউ আছে কিনা সবকিছু জবানবন্দিতে বলেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব এখন প্রকাশ করা যাবে না।

৫ জনের রিমান্ড ৩ জনের স্বীকারোক্তি : জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি ফয়জুল হাসানসহ ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এর মধ্যে হত্যাচেষ্টাকারী ফয়জুল হাসানের ১০ দিন, বাবা হাফিজ আতিকুর রহমান ও মামা ফজলুর রহমানের ৫ দিন, মা মিনারা বেগমের ২ দিন ও ভাই এনামুল হাসানের ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ডে দেয়া ৫ জনের মধ্যে এরই মধ্যে ৪ জনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে ফয়জুলের মামা ফজলুর রহমান ছাড়া বাকি ৩ জনই ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এখনও রিমান্ডে রয়েছেন ফয়জুলের ভাই এনামুল হাসান। মঙ্গলবার এনামুলের রিমান্ড শেষ হওয়ার কথা। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের জালালাবাদ থানার ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শফিকুর ইসলাম স্বপন যুগান্তরকে জানান, আদালতে একের পর এক দেয়া জবানবন্দিতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ প্রমাণে সহায়ক অনেক তথ্যই উঠে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই এসব তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

সৌজন্যে: দৈনিক যুগান্তর

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর