মতামত



দেশদর্পণ ডেস্ক

৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ৭:৫৮ অপরাহ্ণ




শহীদ তালেব ও তাঁর আত্মদানের গর্ব

এনামুল কবির ::
তালেব ছিলেন পা থেকে মাথা পযর্ন্ত এক বীর; যুদ্ধে যাওয়া না যাওয়ার সঙ্গে তাঁর এই কৃতিত্বটা এখানে সহজেই আঁচ করা যায়। প্রকৃত একজন বীরের পরিচয় শুরু হয় আসলে এখান থেকেই। বাঁচা-মরার প্রশ্ন যেখানে অবধারিত, বীরোচিত এমন সিদ্ধান্ত নেয়া সেখানে কোনও কাপুরুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। এখানে যুদ্ধ দিনের মাঠ থেকে বেঁচে ফিরে আসা আর মৃত্যুর মাঝখানে যদি সম্ভাবনার যোগফল হয় শূন্য, তাহলে কিন্তু এই ধাপটি প্রথম অতিক্রম করেই কেউ একজন হন বীর। মুক্তিযুদ্ধে তালেবসহ প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রেও এটা ছিলো সমান সত্য। স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু- এই দুটিকে একই সুতায় বেঁধে তবেই না তাঁরা সেদিন মুক্তিপাগল এই মুক্তিরা আর মুক্তিযুদ্ধারা ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। তারপর মুক্তিফৌজ গড়ে ওঠে যেন ভীমরুলের চাক; তাদের কৌশলের কাছে পাকি-শত্রুপক্ষ প্রায়ই হতচকিত হয়ে পড়ত। তবে এসব প্রশিক্ষিত আর নিয়মিত বাহিনীর ব্যুহভেদ করা তাদের পক্ষে সবসময় সহজ ছিল না। তবে এই ব্যুহভেদ করার লক্ষ্যে তাঁরা ছিলেন একদম মরণপণ; জানবাজ এই যুদ্ধের মাঠে প্রকৃতই একেক জন বীর, মুক্তিযোদ্ধা। অলক্ষ্যে তাদের কারও ভাগ্যেও তখন জুটতে থাকে শেষ পরিনাম- মৃত্যু। তবে বলতেই হবে, তালেবের মৃত্যুটা ছিলো এখানে আরও করুণ; এবং ট্র্যাজিক।

যে আদর্শের পাটাতনে তালেব গড়ে তুলেন নিজেকে, বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ ছিলো তাঁর অপরিমেয় প্রেরণার উৎস। এই উৎসধারা থেকেই তিনি নিজেকে একদিন দাঁড় করিয়েছিলেন আধা-গ্রাম্য শহর সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখার ছাত্রলীগের সম্পাদক হিসেবে। তখনকার সময়টাই ছিলো আসলে ভিন্ন; আদর্শিক প্রণোদনায় পুরো ঐকান্তিক হবার এক সময়। এর মানে তালেবদের এই সময় তাঁদের ছাত্র-রাজনীতিতে আদর্শের কোনও ঘাটতি ছিলো না; সেটা ছিলো উঠতি বুর্জোয়া মধ্যবিত্তেরই হোক আর শ্রেণিহীন সমাজের প্রশ্ন- দরদ ও প্রযত্নে ছিলো আসলেই সারবান। তাদের সেই আদর্শেরই স্ফুরণ ঘটে যুদ্ধের মাঠে; মুক্তিযুদ্ধে, বাঁচা-মরায়; শত্রুর মোকাবেলায়। বলা বাহল্য, একটা আদর্শিক সময়ই জন্ম দেয় আদর্শিক বরপুত্রদের। জাতি পায় সেদিন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের; যারা নিজেকে বিলিয়ে দিতে, উৎসর্গ করতে কখনও দ্বিধা করে না।

ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি টানেন বঙ্গবন্ধু, এই বলে: ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। এদিকে তালেবরাও তখন তাঁদের কাজটা কী সেটা ঠিকই বুঝে নেয়; আর পরাধীনতা নয়, শোষণমুক্ত অর্থনীতি, সাম্য, জাতিরাষ্ট্র, স্বাধীনতার নতুন এক ইতিহাসের জন্য এই হলো তাঁদের নিজেদের সময়! এই ধারায়ই কিন্তু তখন কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠেছিলো তৎকালীন পতন্মুখ পাকিস্তানের রাজনীতি। ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ব এই টালমাটাল দিনগুলোতে তালেবও হয়ে উঠেছিলেন এর যোগ্য কান্ডারি; এক নেতা। যুদ্ধের মাঠেও ছিলো এর ধারাবাহিকতা; তাই এই অকুতোভয় বীরের একসময় শত্রুব্যুহে আটকে পড়া ছিলো যেন খাঁচায় পুরা এক বাঘ-এর কাহিনী। তাঁর ধৃত হওয়ার যে পরিনাম, মুক্তির আকাঙ্খায় নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার বীরোচিত সাহসে সেটা অবশ্যই ম্লান হয়ে যায়। মৃত্যুর সামনেও তিনি সেদিন ছিলেন সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ; ভয় শূন্য, বিশ্বাসে অটল; দৃঢ়তায় উদ্যত, চিত্ত তাঁর তখনও দমে যায়নি একটুও। প্রিয় দেশ, বিড়ম্বিত জাতির জন্য ছিলেন তখনও নিরাপোষ; এবং উচ্চকন্ঠ। শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া এই অসম যুদ্ধে নিজের প্রাণটা যেন তালেব বাজিই রেখেছিলেন। তবে যতদিন না লক্ষ্য সীমায় এসে পৌঁছে যান নিজে, মুক্তিফৌজ, মুক্তিরা, ততদিন কিন্তু তিনি ঠিকই যুদ্ধের মাঠে ছিলেন নিবেদিত সৈনিক। এখানে বোধগম্য কারণে তাঁর শাহাদৎ বরণ করাটা নির্ধারিত সময়ের একটা বৃত্তে প্রাপ্য হয়েই উঠেছিলো।

তালেব তখন ধৃত; একজন বন্দী। তাঁর ওপর চরম আক্রোশে ঝাপিয়ে পড়ে দোসরসহ পাকি-পশুরা। নির্যাতনে পিষ্ট করে থেতলে দেওয়া হচ্ছিল তাঁর পুরো শরীর। অসভ্য, বর্বরতম এই নিষ্ঠুর নির্যাতন চলে যতদিন না তালেব শহীদ হন! এই পৈচাশিক নির্যাতন আর পীড়নে তবুও তালেব ছিলেন অনবনত; উন্নত শির। জুবিলিতে বন্দী এই মানুষটিকে নিয়ে আসলে লোকেরা তাঁর ঋজুতাকে খুঁজে! তারা তখন ব্যর্থ হয়; তারা মুক, তারা অশ্রুসিক্ত মুকের দল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় তারা; দেখতে পায় তালেবদের রাজনৈতিক কোনো সভার স্থলে এটা হলো আসলে শান্তি কমিটির এক ক্যাম্প। বন্দী তালেবের পরিনাম হয়ে ওঠে এবার এই ক্যাম্পে প্রদর্শনের এক বস্তু। দেহের পর শুরু হয় তাঁর মনকে টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে ফেলার কাজ। কথিত এই শন্তি কমিটির পান্ডারা তখন এই একইভাবে পৈচাশিক শান্তি রক্ষায় ছিলো আরও নিচ; ধূর্ত, এবং শয়তান। তবে এই পান্ডারা, এই পিচাশরা অমানুষিক এই লাঞ্চনার জন্য যা ছুঁতে পারে, তা হলো মুক্ত মানুষের কোনও মন নয়; শুধু একজন বন্দীর, তালেবের দেহ; আর যা পারেনি, সেটা হলো তাঁর- তালেবের মন।।

এবার শান্তি কমিটির মঞ্চ থেকে হাঁক ছাড়ে এক পান্ডা- ‘তুই দাঁড়া তোকে সবাই দেখবে’ বলে। তালেবের মূর্তি তখন দেশপ্রেমের বেদিমূলে স্থাপিত হয়ে গেছে। যদিও ক্ষত-বিক্ষত, দূমরেমোচড়ে যাওয়া দেহটি আর নিয়ন্ত্রণে নেই তাঁর! তবুও তাকে টেনে টেনে দাঁড় করানো হলো এবার জনতার সামনে; যে জনতা মুক, বধির নয়; উন্মুখ, উল্লোসিত নয়; তবুও লক্ষণীয় হলো অশ্রুপূর্ণ তাদের চোখ। শান্তি কমিটির পান্ডারা হলো পাকি-পশুদের প্রেতাত্মার দল। এইসব প্রেতাত্মার দলই কি-না সেদিন ওখানে গড়ে তুলেছিলো জুবিলির এই শান্তিমঞ্চ; আর এখান থেকেই চালিয়েছিলো এমন তালেবদের উপর পৈচাশিক ও বর্বরতম নির্যাতন। তবে তারা ভুলে যায় যে, তারাও ছিলো এই একই আলো-বাতাস আর মাটির সন্তান; কিন্তু তারা ছিলো এখানে পুরোই স্ববিরোধী; এবং পাষান্ড বলে একবারের জন্যও তখন ক্ষান্ত হতো না। এখানে কথিত এই শান্তিমঞ্চের পান্ডাদের ভূমিকা হলো আসলে দোসরের; নাটের গুরু হলো তাদের পাকি-হানাদার, পাকি-পশুদের দল। খাঁচায় পুরা বাঘ- তালেবের উপর তান্ডব চালায় এই অনুচর প্রেতাত্মার দলেরাই। উত্থিত সূর্যকে মেঘ কতটুকু সময়ই বা আর আটকে রাখতে পারে? সুনামগঞ্জ মহকুমা স্বাধীন হবার মাত্র কয়েক মিনিট পরই শহীদ হন বীর তালেব। সম্ভবত তিনিই হলেন এই অঞ্চলের বীর বাঙালির মধ্যে শেষ শহীদ। আহসানমারা ফেরির কাছে পাওয়া যায় তাঁর মৃতদেহ। তাকে এখানে হত্যা করে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তাঁর রক্তের দাগ হাতে করে নিয়েই তবে ৬ ডিসেম্বর পালিয়ে যায় পাকি-হানাদারেরা।

প্রকৃতই যে বীর সে কখনও ডরে না; যে ডরে সে বড়জোর হাঁট ুগেরে বসে থাকতে পারে। তালেবের বা তখনকার এমন তারুণ্যের ধর্মে এটা ছিলো সম্পূর্নই বিপরীত। এই হাঁটু গেরে বসে থাকায় কাপুরুষের যত আনন্দ! একমাত্র এই কাজে সে পটু; কারণ সে কাপুরুষ। এমনও নয় যে তার যোগ্যতার এটা বিশেষ দিক। অবশ্য যে কাপুরুষ তার জন্য এটা বেশ মানানসই এক দশাই বটে। একদিন সে ঠিকই তখন পৈচাশিক নিষ্ঠুরতার সীমায় পৌঁছায়। এই কাজে সে প্রয়োগ করে তার শক্তি বা ক্ষমতার সবটুকু। তার এই পৈচাশিক নিষ্ঠুরতার উৎস হলো আসলে তার ভয়। কীসের আড়ালে সে ঢেকে রাখে তার মুখ? পবিত্র পোষাক আর ভেক তখন হয়ে উঠে তার মূলধন। জীবনের পরিবর্তে সে তখন ফেরি করে বেড়ায় মৃত্যুর জিকির। অপরদিকে যে বীর, তালেবরা এখানে কিন্তু হাঁটু গেরে বসে থাকার চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় বলে জানে। মৃত্যু হলো তাঁদের পায়ের ভৃত্য। যিনি বীর, এই মৃত্যুকে দলিত করে তবেই তিনি এগিয়ে যান; অন্তিম কাজ কিংবা নিজেকে উৎসর্গ করার মহত্তই¡ হয়ে উঠে তাঁর ঈপ্সিত। এখানে এই উৎসগকৃত প্রাণ যাতে সবার প্রাণের মধ্যে তৈরি করে প্রাণের এক মুক্তাঞ্চল- এই হলো তাঁর আশা; জীবনের তাবৎ লক্ষ্য। বীরের এই প্রণোদনা ওঠে আসে তার বুকের গভীর থেকে; ভেতর থেকে দেখতে পান তিনি- কল্যাণের এই বীজমন্ত্র হলো তাঁর সাহস। তাই ব্যক্তি জীবনের মৃত্যু তাকে আর ভয় দেখাতে পারে না; তিনি প্রকৃতই তখন হয়ে ওঠেন মৃত্যুর চেয়ে বড়।

সেই শান্তিমঞ্চে দেখা যায়, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তালেব তখন বলছেন-

‘ভাইয়েরা আমার, আজ শত্রুর হাতে আমি বন্দী। আমাদের জীবনের সব আদর্শ এবং বিশ্বাসকে ওরা লোভ দেখিয়ে কিনে নিতে চাইছে। কিন্তু ভাইয়েরা আমার, যে পথ আমি এতদিন অনুসরণ করে এসেছি আজ জালিম শাহীর কোন অত্যাচার আমাকে আমার বিশ্বাস থেকে একচুলও সরাতে পারবে না। ওদের অত্যাচার যত নির্দয় হচ্ছে, আমার বিশ্বাস ততই দৃঢ়তর হচ্ছে।’ (সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ, রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু, ২০০৮)

এখন তালেবের এই মৃত্যু বরণ, তাঁর শহিদত্ব লাভ- এটা পারা না পারার সাথে আমাদের যে ব্যক্তি বৈশিষ্টের কথা ব্যাখ্যা করে, কার্লাইলের কোনও সাক্ষ্য ছাড়াই বলা যায়, সেটা হলো- তাঁর বীরত্ব। সবার দ্বারা কিন্তু সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না; যদিও ব্যক্তির নিজের জন্য এই অর্জনটা বেশ গর্বের, তবু ভাববাদিতায় সেটা কম পুরুষোত্তম সত্য বলে মনে হয় না। এখানে কথা হলো ব্যক্তি তালেবের জন্য তারঁ এই আত্মদানের গর্ব আর কতটুকু কাজে আসে? এই স্বার্থহীন আত্মদানকে স্বীয়সমাজ অবশ্য তখন তাদের গর্ব বলে লালন করে। ইহজাগতিক জীবনে বীরের এই অনুপস্থিতি বা মৃত্যু তখন হয়ে দাঁড়ায় মানবীয় ইতিহাসের বিচারে তাঁর এক ভিন্ন মাত্রার উপস্থিতি। যেখানে ব্যক্তি ও তার তাৎপর্য লাভ করে চিরকালের এক ঐতিহাসিকতা। যেখানে কোনও জড়া নেই; বার্ধক্য নেই, কোনও মৃত্যু নেই। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, এই মৃত্যুকে জয় করতে পারাই হলো বীরের ধর্ম। বাস্তবে তালেব এর বাইরে কখনও কিছু ছিলেন না; সম্পূর্ণরূপেই তিনি সেদিন জয় করতে পেরেছিলেন তাঁর নিজেকে।

পুনশ্চঃ কথা হলো জাতিরাষ্ট্রের এই বিকাশপর্বে তালেব ছিলেন রাজনীতির মানুষ; তাঁর পাথেয় ছিলো খোদ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। তবে তাঁর এই রাজনীতি আজকের প্রথাগত রাজনীতি ও ছাত্র-রাজনীতির সাপেক্ষে কেন অননুকরণীয় হয়ে উঠলো- সেটা অবশ্যই বিচার্য। গোত্রচেতনায় আবদ্ধ না থেকে যাঁর চেতনা ছিলো জাতিগত রূপেই পুষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এসেছিলো তাঁর জন্য অখন্ড এক সত্তার পরীক্ষা ও কর্তব্যজ্ঞান, সেখানে এই তালেবের উত্তরাধিকার আজ কোথায়?

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর