মতামত



দেশদর্পণ ডেস্ক

১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ




শহীদ কৃপেন্দ্র ও আমাদের ইতিহাস চর্চার দীনতা

এনামুল কবির ::
ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য; এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তবে এদিক থেকে মনে হয়, শহীদ কৃপেন্দ্র এখন ইতিহাসের সমসাময়িক এক ট্র্যাজিক চরিত্র। সবার দ্বারা যখন সমসাময়িক হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না, কৃপেন্দ্র ছিল তখন তার বিপরীত; ইতিহাসের গতির নিয়ামক। বস্তুত: ব্যক্তি নিজেই নিজের ইতিহাস রচনা করে। ইতিহাসের এই স্রোতধারায় ব্যক্তি কৃপেন্দ্র যতই তাঁর সমষ্টিগত জীবনের ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হোক না কেন- ব্যক্তির সুকৃতির মতো তাঁর বীরত্বের এখন মৃত্যু নেই। কৃপেন্দ্রের জন্য এই ব্যাপারটা ছিল একজন ব্যক্তি ও তাঁর সুকৃতির একটা গৌরবময় অধ্যায়; কিন্তু মুক্ত ও স্বাধীন জীবনের জন্য তাঁর উত্তরাধিকার হলো সম্পূর্ণই ঐতিহাসিক। কোনো জাতি যখন তার ইতিহাস ভুলে যায়, তখন এই জ্ঞাতিপাপের জন্য তারা একসময় নিবীর্য হতে বাধ্য।

কিন্তু ট্র্যাজেডির মূল বৈশিষ্ট্য মৃত্যু নয়, করুণা; বীররসের আধিক্য হেতু তার সমাবেশ ঘটলে পরিপার্শ্বে তখন শিল্পসম্মত সংক্রমণের সূচনা করে। ইতিহাস ও শিল্পকর্ম এক না হলেও কখনো কখনো এমন ঘটনাচিত্র হরহামেশা দেখা যায়। কৃপেন্দ্রের ক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাসটা যদিও বীর মুক্তিযোদ্ধার, তবে ইতিহাসের বিষয়চর্চার প্রেক্ষিতে তাঁর নামমাত্র উপস্থিতি এখন আরও সকরুণ ও ট্র্যাজিক; এতে সন্দেহ নেই। এখানে তার দায়ভার মেটানোর একটা চেষ্টা করা যায়। কৃপেন্দ্রের জন্ম, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার অনতিদূর- পাগলা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে। তখনকার দশটা পরিবারের মতো দর্পনারায়ণ ও সুরবালা দাশের চার পূত্র ও দুই কন্যা; কৃপেন্দ্র ছিল তাদের দ্বিতীয় সন্তান। বড় পরিবারের ভগ্নদশাটা তখন কারো নজরে না পড়লেও বেশ বুঝা যায়, তাদের আটপৌর জীবনে তার একটা কারণ ছিল কৃপেন্দ্র; তাঁর বাড়তি সহায় সম্বলের যোগানদার হয়ে ওঠা। কৃপেন্দ্র তখন পেশায়- বাসের চালক; সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট পর্যন্ত ছিল তাঁর দৌঁড়। অর্থনৈতিক যুদ্ধের এই বাস্তবতার মধ্যে কৃপেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের সামনে এসে হাজির হয়। এই যুদ্ধে মনস্থির করা ছাড়া তাঁর উপায় ছিল না। কৃপেন্দ্রের বয়স তখন সাকুল্যে বত্রিশ; তাঁর বন্ধু বাৎসল্যের অংশীদার অনুজ কানু দাশের এমনটাই অভিমত। এই হিসেবে কৃপেন্দ্রের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিঃ তে। বলা বাহুল্য এই পরিণত বয়সকে সঙ্গী করে সে ভারত পৌঁছে; তবে শরণার্থী হিসেবে নয়। এখানে প্রতিরোধ ও যুদ্ধের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেবার ব্যাপারটা ছিল নির্ধারিত। তাই জনশ্রুতি ছাড়া তখন এটা ছিল বাস্তবতা দ্বারা তাড়িত। কৃপেন্দ্রের জন্যও তার ব্যতিক্রম ছিল না; স্বভাবত গন্তব্যই তখন তাঁর পথের দিশা হয়ে ওঠে। এখানে স্বল্প মেয়াদী একটা প্রশিক্ষণপর্ব তাকে শেষ করতে হয়। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে এই স্বল্প প্রশিক্ষণের সঙ্গে তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছাই ছিল আসল অস্ত্র। পরবর্তীকালে, তালেবদের গ্রুপের সঙ্গে লড়াইয়ের মূল মাঠে ফিরে আসলে দেখা যায়, এই সহজাত ক্ষমতার গুণেই একসময় সে তালেবের আরও নিকটবর্তী হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ নয়মাসব্যাপী এই মুক্তিযুদ্ধে কারা কৃপেন্দ্রের সঙ্গী ছিল তা নিরূপণ করা দুঃসাধ্য হলেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাদের মধ্যে- তালেব ছিল একজন। তবে প্রতিটি বাঁচা-মরার যুদ্ধে তাদের সতীর্থ হয়ে ওঠা এখন এরচেয়েও বেশিকিছু ব্যাখ্যা করে। এখানে আঁচ করা যায়, তালেব ও কৃপেন্দ্র তারামৈত্রীরূপে যুদ্ধের মাঠে উভয়ই হয়ে উঠেছিল এক সম্মিলিত চিদাত্মা। এমনকি, শেষ পরিণতিতে, এমনই ছিল তাদের ভাগ্য; দুজনই ২৯ নভেম্বরের দিকে ধৃত হয়। খাঁচায় পোড়া বাঘের সাথে এর তুলনা করা যায়। মূলত শত্রুর ব্যুহ ভেদ করতে গিয়ে এই সর্বনাশ ঘটে। তাদের অপরিণামদর্শী সাহসই তার একমাত্র কারণ তা বলা বোধ হয় শোভন হবে না। কেননা যুদ্ধের মাঠে ভয় আছেই; তার বাস্তব কারণেই এটা সত্য। তবে সতর্কতা দিয়ে একে দূর করে, তার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে হয়। এই সতর্কতা তাদের ছিল না তা বলা হবে বীরত্বের প্রতি অপমানের সামিল। এখানে ওৎপাতা ফাঁদ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টি ছিল- মুক্তির নেশায় আচ্ছন্ন; বরং এটাই বলা হবে অধিক যুক্তিযুক্ত। গুলির মজুত তখন শেষ, তারওপর সামনে পাতা ফাঁদ- এই সন্নিকট পরিণাম থেকে ততক্ষণে তাদের বেরিয়ে আসা ছিল কার্যত অসম্ভব। তাই, কৃপেন্দ্রের প্রতি তালেবের অব্যাহত ‘গুলি’ ‘গুলি’ এই নির্দেশ ছিল যেমন সতীর্থের প্রতি সতীর্থেও, তেমনি অস্তিত্বের; একসাথে বাঁচা ও মরার শেষ চেষ্টা, লড়াই। তৎপূর্ব সময়ের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার হদিসটা এখানেও হয়তো অব্যাখ্যাত থাকে না। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্যের সীমা ছিল প্রলম্বিত।

পাকসেনার নির্যাতনের মুখে এখন বন্দী তালেবের ঋজুতা প্রায় মিথের পর্যায়; স্বাধীন ইতিহাস চর্চার পরিবর্তে তালেব হয়ে ওঠে পৌরাণিক চরিত্র। কিন্তু কৃপেন্দ্রের কথা স্মৃতি-বয়ানে একইসঙ্গে উচ্চারিত না হওয়াটা হলো অস্বাভাবিক। পারিপার্শ্বিক জগতের একটা বাস্তবতা হলো সবসময় পাদপ্রদীপের আলো এসে পড়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর। ব্যক্তি-মর্যাদার চেয়ে একটা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজের এটা হলো তার স্বাভাবিক পরিণতি। তালেব যেখানে রাজনীতিক, নেতা, কৃপেন্দ্র ছিল সেখানে প্রকৃতই সাধারণ, শ্রমজীবি মানুষ। তবে শ্রেণি বিচারে প্রলেতারিয়েত হলেও সে মুঢ় ছিল না; বরং সজাগ দৃষ্টির একজন বলেই তাকে জানা যায়। কিন্তু সমসাময়িক দায়িত্ব গ্রহন ও পালনে সে যেমন মহত্ত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, একইভাবে ব্যক্তি-চেতনায় সে হাটু গেরে বসে থাকার চেয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করার মতো বীরত্বকেও প্রতিষ্ঠা করে। এই অভুতপূর্ব বিকাশের ক্ষেত্রে তাকে প্রান্তজ মনে করা হবে নির্বুদ্ধিতা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপনা সত্ত্বেও এখন কৃপেন্দ্রের যা দূর্ভাগ্য, তা হলো তাঁর বিস্মরণের ভাগ্য। মনে হয় কৃতঘœতার একটা সীমা থাকা দরকার। বাস্তবে ইতিহাস হলো এইসব সাধারণ মানুষেরই অসাধারণ কীর্তি। মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার বস্তুনিষ্ঠ কেন্দ্রাতীক চরিত্রে তাদেরই অধিষ্ঠান দেখা যায়। এখানে সাধারণ মানুষই হলো ইতিহাসের মুল রচয়িতা। কোনোকিছু দেখতে শেখার ব্যাপারটা আসলে শ্রেণি চেতনা দ্বারা নির্ধারিত। তালেবের সুবিদিত নীতিনিষ্ঠার সাথে কৃপেন্দ্র তখন যোগ করে তাঁর শ্রেণিগত সাধারণ ইচ্ছাকে; শেষ পর্যন্ত মনে হয়, তাঁর বিবেকখ্যাতি ও বন্ধুতার পরাকাষ্ঠাকে। বস্তুত রাষ্ট হলো একটা সাধারণ ইচ্ছার ফল; এই ইচ্ছার বলেই মুলত তালেব ও কৃপেন্দ্রের মধ্যে তাদের বীরত্বপূর্ণ সতীর্থতা লাভ একসময় চরিতার্থ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে যুদ্ধের মধ্যেই ছিল তার বাস্তব ক্ষেত্র। কিন্তু প্রতিতুলনা এমনই যা জন্ম দেয় হীনমন্যতার। একমাত্র বস্তুনিষ্ঠ মনোবৃত্তি ছাড়া তা থেকে মুক্ত থাকা অসম্ভব। সুনামগঞ্জ পাক-হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। আবার এই একইদিন- তালেব ও কৃপেন্দ্রের বন্দীজীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু এই পরিণতির ফল হলো তাদের এতদঞ্চলের শেষ শহিদত্ব লাভ।

সুনামগঞ্জ তখন মহকুমা শহর; এখান থেকে আহসানমারা ফেরিঘাটের দূরত্ব প্রায় ১৫ কি.মি.। পাক-হানাদার বাহিনী এবার পাত্তারী ঘোটালে সড়কপথ ধরে নির্গমনের জন্য তারা একসময় এই ফেরিঘাটে এসে পৌঁছে। বন্দীদশার সঙ্গে সাত দিনের মাথাই তারা তৃতীয় একজন মুক্তিযোদ্ধাসহ তাদের দুজনকেও তখন সাথে নিয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার; তাই ফিরতি পথে আহসানমারা ডরের দক্ষিণ পাড়ে পৌঁছে তাদের মনে হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না যে, তারা- ততক্ষণে বিপদ সীমার বাইরে এসে উপস্থিত। তাদরে পেছনে সুনামগঞ্জ তখন মুক্ত; কিন্তু পলায়নপর এই মুহূর্তেও তাদের পৈচাশিকতার বিরাম ছিল না। এবার পাক-বাহিনী ‘জয় বাংলা’র তালেব, গণযোদ্ধা কৃপেন্দ্র ও এক অজ্ঞাতনামা মুক্তিযোদ্ধাকে পাড়ে টেনে একটা সুবিধামত জায়গা বেছে নেয়। তখন ব্যর্থতার গ্লানিবোধ থেকে তারা প্রতিশোধের শেষ সীমানায়। তাই হাত রাখে ট্রিগারের ওপর; ব্রাশফায়ারে- এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে রেখে যায়। উজানীগাঁও বাজারের সন্নিকটে, লোকমুখে যার পরিচিতি তেগাঙের মুখ- সেখানে লাশ তিনটি কদিন পরেই ভেসে ওঠে। স্থানীয় লোকজন অনবহিত ছিল না; তাই অধিক সময় ব্যয় না করে সহজে লাশ ৩টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাদের দেহ ছিল ক্ষত-বিক্ষত, ফোলা; তিনজোড়া চোখের সব কয়টিই দেখা যায় উপড়ে ফেলা; সেটা মনে হয়, বন্দীশালার কাজ। লাশ উদ্ধারের এই সংবাদ আশে পাশে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া সঙ্গত কারণে তখন এদিকে ছিল সবার নজর। তাই অনতিবিলম্বে এসে হাজির হয় বিশজনের অধিক একদল সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা; গোটিকয় স্বজন; নৃপেন্দ্র, কৃপেন্দ্র দাশ; পাগলার আব্দুল মতলিব, আরমান আলী, আব্দুল জব্বার; স্থানীয়দের মধ্যে দুই ঝালু- যার একজন আব্দুল আজিজ ওরফে লাম্বা ঝালু, অন্যজন- সোনা মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা ঝালু। শহীদ ‘ভাই’দের ত্রয়ী লাশ সমাহিত করার প্রশ্নে স্বজনদের পরিবর্তে তখন উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারাই সিদ্ধান্ত নেয়। এখন জয়কলস-উজানীগাঁও রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ সংলগ্ন একই সমাধিতে তাঁরা সমাহিত। এখানে কে হিন্দু বা কে মুসলমান তা জিজ্ঞেস করা হবে মূঢ়তা।

কিন্তু, যে সমাজে কৃপেন্দ্রের জন্ম, সেই সমাজকেন্দ্রে তখন ব্যক্তির কোনো স্থান ছিল না; সেখানে যেমন ধর্মই ছিল প্রধান, মূলতন্ত্র, তেমনি ভিন্ন ধর্ম ও ক্ষুদ্র জ্ঞাতিগোষ্ঠী ছিল তখন সম্পূর্ণই প্রান্তিক। স্বভাবত পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে ধর্মপরায়ণতার নামে গোটা সমাজদেহ সাম্প্রদায়িকতার উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাস্তবিক কারণে তখন তার বিবরণসহ রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রভাব ছিল আরও অমানবিক। বাঙালি মুসলমানের তুলনায় দস্তুরমতো তখন বাঙালি হিন্দুরা অর্থনৈতিক নিবীর্যকরণের শিকার হয়; সমাজের বাইরে তারা হয়ে ওঠে- আগন্তুক। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধই ঠুকে দেয় শেষ পেরেক; এছাড়া তখন তার অপনোদনের কোনো বিকল্প ছিল না। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য তার সগোত্রীয় প্রেতাত্মারা তখনও ছিল সজাগ; ঝোঁপ বুঝে কোপ মারার অর্থনীতিই ছিল তাদের মোক্ষ। তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবশিষ্টাংশে তার অনুপ্রবেশ ছিল স্বজাতির পিঠে ছুরিকাঘাতের সামিল। বস্তুত: ধর্মরাষ্ট্র-রক্ষার নামে এটা ছিল তাদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের সময়। কৃপেন্দ্ররা ছিল তার চাক্ষুস স্বাক্ষী; নিজ গ্রামের কতিপয় মুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুবর্গের কাছে পরিচিত মুখ হবার পরও যখন তাদের কাছে সে অপরিচিত ঠেকে, তখন তাঁর চিৎবৃত্তিতে সার্বিক মুক্তি ও পরিবর্তনের আকাঙ্খা জেগে ওঠা ছিল তার স্বাভাবিক পরিণতি। তাই মুক্তিযুদ্ধ যেমন তাঁর কাছে একটা বিহিত ব্যবস্থা হয়ে ওঠে, তেমনি তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙ্গে নতুন করে নির্মাণের জন্য আমৃত্যু লড়াই করা। নিজের মনের দৃঢ়তা ও সজীবতা অটুট রেখে মন্ত্রগুপ্তির এই সংকল্পে কৃপেন্দ্র- মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। ইতিহাসের গতিপথে অবশিষ্টদিন এই মুক্তিযুদ্ধই ছিল তাঁর সাধনপদ্ধতি।

বিরানব্বই সালের দিকে মনে হয়, কৃপেন্দ্রের নামের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। সঙ্গত কারণে আমাদের পরিচয়টা তখন ইন্দ্রিয়ের তথ্য দ্বারা জাড়িত হবার সুযোগ ছিল না। তাই বাস্তব জগতে তাঁর উপস্থিতিটা ছিল স্রেফ স্মৃতির বয়ান নির্ভর। কিন্তু ইতিহাসের স্ব-নামে, এখন মনে হয়, একটা শব্দের চেয়ে বেশিকিছু নয়। অবশ্য স্বাধীনতার অন্যুন বিশ বছর পর, বালকের যুদ্ধজয়ের গল্প শোনার মতো ইতিহাসের এই স্মৃতি-আলোচনায় আমার প্রবেশ। এখানে কৃপেন্দ্র তার একটা চরিত্র বটে; তবে, সে ছিল তাঁর নামবাচক পদের মধ্যে সম্পূণই নির্বাপিত। কিন্তু এই চিত্রায়নের বাইরে কৃপেন্দ্র ছিল প্রকৃতই বীর, মুক্তিযোদ্ধা। এটা অনুধাবন যোগ্য যে, প্রতিটি শব্দমাত্রই বোবা; তবে, কৃপেন্দ্রের ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় চোখে না পড়ার একমাত্র কারণ হলো আমাদের অনুদার ইতিহাস চর্চার ফল। প্রতিটা শব্দ জীবনের উত্তাপে জড়িত হওয়া মাত্র যেমন বোধগম্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, তেমনি পরম্পরা সুত্রে জীবনকেও তা প্রকাশ করার মাধ্যমে পরিণত হয়। জাতির দূর্ভাগ্য থেকে তার মুক্তি পর্যন্ত বীর-বন্দনা হলো তেমনই কিছু শব্দসমষ্টির পাঠ। কৃপেন্দ্র ছিল বীরের প্রতিকৃতি; তাই, ঐতিহাসিক মুহূর্তে জাতির স্বাধীনতাকে সে নিজের জীবন ও মৃত্যুর কেন্দ্রে স্থাপন করতে সক্ষম হয়; লাভ করে অস্তিত্বের চরিতার্থতা। এই ভ্রাতৃঋণ শোধ করা এখন বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব; তবে তার যৎকিঞ্চিত চেষ্টা না করা হবে কৃপেন্দ্রের প্রতি আমাদের ঐতিহাসিক অবিচার।

লেখকের অন্যান্য কলাম-
রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ
শহীদ তালেব ও তাঁর আত্মদানের গর্ব