মতামত



দেশদর্পণ ডেস্ক

৬ নভেম্বর ২০১৭, ১:৫৬ অপরাহ্ণ




রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ

এনামুল কবির
রুশ বিপ্লব সংঘঠিত হয় ১৯১৭সালে; ৭ নভেম্বর। এই বিপ্লব একদিনের কোনও ব্যাপার ছিলো না; এর পশ্চাতে ছিলো বিস্তর ঐতিহাসিক প্রণোদনা। এখানে বুর্জোয়া বিপ্লবী মুহূর্তগুলোর বিপরীতে এর অপরিমেয় তাৎপর্য হলো ভাবাদর্শের ইতিহাসে সমাজতন্ত্রের বাস্তব রূপায়ন; সোভিয়েত ইউনিয়ন-সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। এখন এই সমাজ তার কালপর্বসমেৎ শুধুই স্মৃতি; তবুও এর মধ্যে আছে সেই সাক্ষাৎপূর্ণ সময়ের অভিজ্ঞতা আর উত্তর সাধনার প্রশ্ন- দায়মোচনের চেষ্টায় সে এক পথ নির্দেশ। ইতিহাসের কাছে ইতিহাসের যে কোনও পাঠ শুধু সেটাই চায়; সকল সময়ে ইতিহাসের সেই শিক্ষাটাও হল তা-ই।

এদিক থেকে রুশ বিপ্লব ছিলো ইতিহাসের সাক্ষাৎ অনুবর্তীর ফল; এর অনিবার্যতা ছিলো বাস্তব সেই ইতিহাসের নিয়ম আর দর্শন জাত অমোঘ বাস্তবতা তাড়িত- ঐতিহাসিক এক দ্বান্দ্বিকতা। এই প্রত্যয় সিদ্ধতা অবশ্য ট্রটস্কির। তবে তাৎপর্যে এই বিপ্লব ছিলো কেবল স্থানীয় জার রাশিয়ার একার ব্যাপার- তা মনে করার কোনও কারণ নেই। সমতাপূর্ণ সমাজনির্মাণের দুর্মর এক আকাঙ্খায় এর আবেদন ছিলো আসলেই বৈশ্বিক। স্বভাবত এই দিক থেকে রুশ বিপ্লব রচনা করেছিলো কেবল সমতাপূর্ণই নয়, শ্রেণিহীন সমাজনির্মাণেরও পরিস্থিতি; এবং অবশ্যই এক উত্তরাধিকার। তাই নভেম্বরের এই বিপ্লব ক্যালেন্ডারের বিস্মৃত কোনও তারিখমাত্র নয়; বাস্তবিক অর্থেই এর তাগিদ ছিলো দরদপূর্ণ সমাজজীবনের আলেখ্য। সেই সাথে যদি বলা হয়- স্মৃতিই জীবন, তাহলে সোভিয়েত এই সমাজের প্রতিষ্ঠা ছিলো এককথায়- অভূতপূর্ব; গোটা মানবজাতির নতুন এক সমাজজীবনে অনুপ্রবেশ।

প্রতিটি বিপ্লবই- বিপ্লবী মুহূর্তের অনবদ্য এক কীর্তি; সংস্কারের প্রশ্নে সে কখনও ধীরপায়ে হাঁটে না, সবকিছুই কেমন দুমড়েমোচড়ে দেয়। পুরাতন সমাজ গুঁড়িয়ে তবে গড়ে তুলে নতুন এক সমাজব্যবস্থা। বিপ্লব প্রকৃতই তখন হয়ে উঠে কোনও এক সমাজ থেকে পৃথক সমাজে অনুপ্রবেশের উল্লম্পন বিশেষ। স্বধর্মে এটাই বিপ্লবের পরিচয়। বিপ্লবী এই মুহূর্তের জন্য এর আবশ্যকীয় শর্ত হল কতিপয় অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্ব; বাহ্যিক শর্তরূপেই এই দ্বন্দ্ব একসময় এসে হাজির হয়। বিষয় আর বিষয়ীর যুগপৎ সম্মিলন তখন জন্ম দেয় ঐতিহাসিক সেই মুহূর্ত- বিপ্লবের।

রুশ বিপ্লবেও এর ব্যত্যয় হয়নি; পেছনকার সেই বস্তুগত শর্তের জের হিসেবেই এই বিপ্লব সংঘটিত হয়। এখন কথা হলো কেমন ছিলো সেই বিপ্লবপূর্ব সময়? বলতে গেলে ঊনিশ শতকের এই সময় ছিলো ভাঙাগড়ায় ভরা; সামাজিক কী অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক- প্রতিটি ক্ষেত্রে রাশিয়া ছিলো তীব্র সংকটের শিকার। এর মধ্যে স্বাধীনচেতা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে না ওঠা কম বড় সমস্যা ছিলো না। ইউরোপের ব্যাপারটা ছিলো এখানে ভিন্ন; শিল্প বিপ্লবের ফলে এর বণিক আর শিল্পপতিরা অর্থনৈতিক প্রাধান্যের সাথে উচ্ছেদ করে রাজতন্ত্রকে আর ছিনিয়ে নেয় রাজনৈতিক ক্ষমতা। বিপরীতে এই সময় রাজনৈতিক স্বাধীনতা সর্ম্পকে কিন্তু রাশিয়ার কোনও স্পষ্ট ধারণাই ছিলো না। এই দারিদ্র ও সংকটের মধ্যে তখন রাশিয়ায় অনুপ্রবেশ ঘটে বিভিন্ন নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীর; যেমন- নিহিলিস্ট ও নারদনিকদের। সেই সাথে রাশিয়ায় পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটেনি তা বলা যাবে না। কৃষিপ্রধান এই দেশে এক সময় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে; এবং একই সাথে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে উত্থান ঘটে শ্রমিকশ্রেণীর।

এই শ্রমিকশ্রেণির অনুপ্রেরণায়ই রাশিয়ায় মার্কসীয় সাম্যবাদী দল হিসেবে ১৮৯৮ সালে গঠিত হয় ‘রুশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেট অ্যান্ড লেবার পার্টি’। লেলিন অবশ্য তখন উপস্থিত থাকতে পারেননি; নির্বাসন দন্ডে তিনি ছিলেন সাইবেরিয়ায়। মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ছিলো অনিবার্য; পাঁচ বছরের মাথায় তাই বলশেভিক ও মেনশেভিক- এই দুইভাগে পার্টি ভাগ হয়ে যায়। রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪-১৯০৫) রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয় ঘটলে সংঘটিত হয় ১৯০৫’র প্রথম রুশ বিপ্লব। পরবর্তীতে ১৯১৪’র আগস্টে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ; রাশিয়াও এর বাইরে থাকতে পারেনি। ফ্রান্সও ইংল্যা-ের সাথে সে জোটবদ্ধ হয়ে এই যুদ্ধে যোগ দেয়। যে জারতন্ত্রের অপ্রতিহত ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য ছিলো সৈ¦রশাসন আর দুর্নীতি, যুদ্ধশেষে সেই কর্তৃত্ব বিপুল সংখ্যক সৈনিকের মৃত্যুর হাহাকারের সাথে খাদ্য ঘাটতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামাতে তখন ব্যর্থ হয়। ফুসে ওঠা অতিষ্ঠ জনগণ এই পর্যায়ে মুক্তিলাভের জন্য ডাক দেয় ধর্মঘটের; তখন প্রাণ দেয় দেড় শতাধিক আন্দোলনকারী শ্রমিকরা। এভাবে ২৬ ফেব্রুয়ারির পর আসে ২৭ ফেব্রুয়ারি; বিপ্লবীদের দলে সেদিন এসে যোগ দেয় পেত্রগ্রাদ রক্ষাকারী- সেনাদল। এবার অস্থায়ী সরকার গঠন করতে বাধ্য হন জার দ্বিতীয় নিকোলাস। এখানে গ্রামসির বিবেচনা হলো, ‘জনগণের চাপে পটপরিবর্তনের এই ঘটনাই ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত, যা এই বছরই অক্টোবর বিপ্লবের ভিত্তিভূমি ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।’

এককথায় খোলস বদলের চেষ্টা কিন্তু কখনও কম হয়নি; রেনেসাঁস তো ছিলোই, সেই সাথে ছিলো শিল্প বিপ্লব আর সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বাণীবাহক- ফরাসি বিপ্লব।এখানে রেনেসাঁ’র দাবি ছিলো যুগ প্রবর্তনের; বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক এক রূপান্তর সাধনই ছিলো এর মর্মশাঁস। পুনরাবৃত্তির সম্মোহ থেকে বাইরে আসার ব্যাপারে সেটা প্রণোদিত করে মনীষাদীপ্ত প্রতিভাকে। এবার শিল্পবিপ্লব উত্তর সমাজে তাঁরাই হয়ে উঠলেন এর মূল বিচারক; মানবতাবাদী। তাঁরা দেখলেন- এ এক নতুন সমাজ; ‘গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর সম্পদ-সম্পত্তি বলতে কিছুই ছিল না। ছিল শুধু শ্রমের ক্ষমতা। আর এই শ্রমের ক্ষমতা বিক্রি করেই তাদেরকে জীবন ধারণ করতে হতো। তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিত কলকারখানার মালিকরা। উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পর শ্রান্ত-অবসন্ন কালিঝুলি মাখা এই মানুষগুলো গিয়ে ভিড় করত ভাটিখানায়। ভিড় করত পতিতালয়ে। এইভাবে জীবন চলত একই লয়ে- ক্লেদাক্ত, ঘৃণ্য, অসহনীয়।’ (সৌমেন বসু, শতবর্ষে অক্টোবর বিপ্লব, নতুন দিগন্ত, অক্টোবর-ডিসেম্বর’২০১৭)

এখানে সেসব মানবদরদি মনীষা আরো লক্ষ্য করলেন যে, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেøদ’ কত ভয়াবহ! মুক্তির চিন্তাটাও ছিল তাই তাদের স্বভাবজাত; দরদি এক হৃদয়ের ব্যাপার। মার্কস এই জায়গায় নিয়ে আসলেন তাঁর সমাজ বিকাশের নিয়ম আর বিচারধারা- দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি। শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বÍ এবার হয়ে উঠলো বিশ্ব ইতিহাসপাঠের মূলসূত্র; ইতিহাসের বস্তুবাদী পাঠ। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, শিল্প বিপ্লবের ক্লেদাক্ত ফলই আসলে জন্ম দেয় মানবমুক্তির এক দর্শনের; মানবতা থেকে সমাজতন্ত্র তথা শ্রেণিহীন সমাজের বৈপ্লবিক তত্ত্ব। এর অর্থ হলো শৃঙ্খলমুক্তির ইতিহাসে শ্রেণিশাসন থেকে যখন সাধারণের আর মুক্তি আসছিলো না, তখন প্যারি কমিউন থেকে রুশ বিপ্লব রচনা করে এর নিজস্ব পথ; রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। সংঘটিত এই বিপ্লব এই জায়গায় দাঁড়িয়ে এসে আমাদের ঘোষণা করে, ‘পৃথিবীটা আমার নয়, আমাদের।’

এবার সংঘটিত এই বিপ্লবের পথ ধরে দর্শনের সাথে সমাজটাও তাই বদলে গেলো; চিন্তার দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে আসলো প্রকৃতই নতুন চিন্তা-চেতনা-সংস্কৃতি। কোন শৃঙ্খল নয়, দাসত্ব নয়; সকল প্রকার পীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি। পুঁজির শোষণ আর থাকলো না, এর একাধিপত্যও নয়; ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে এখন ঘোষিত হলো পুঁজির সামাজিক মালিকানা। শৃঙ্খল মুক্তির গান পরিণত হলো মানবিক মুক্তির আকাঙ্খায়; শ্রমদাস থেকে মজুরি দাস, নারীর অবদমন আর শিশুশ্রম- নিষিদ্ধ হলো। সুরক্ষার স্বার্থে গৃহিত হলো পরিকল্পিত অর্থনীতি। তখন সম্ভাবনার এমনই এক দ্বারে প্রবেশ করে রাশিয়ার বৃহদাঞ্চল; পূর্ব ইউরোপ।

লেনিন ছিলেন তখন সুইজারল্যাণ্ডে নির্বাসিত; এই সময়ই সংঘটিত হয় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব। কেরেনস্কির নেতৃত্বে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার; কিন্তুু নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তাঁর বুর্জোয়া সরকার আর সামাল দিতে পারছিলো না। মেনশেভিকরা যেখানে ছিলো দোদুল্যমান, বলশেভিকরা সেখানে দেখালেন তাদের বিচক্ষণতা; বিপ্লবের অপরিমেয় সুযোগ কাজে লাগাতে তাই তাঁরা তেমন ভুল করেনি। ৩রা জুলাই সরাসরি তাঁরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে কেরেনস্কি সরকারের বিরুদ্ধে; বলশেভিকরা কিন্তু সেবার ব্যর্থ হয়। নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের শিকার হয় তাদের নেতৃবৃন্দ। ৯ অক্টোবর দেশে ফেরেন লেনিন; অভ্যুত্থান যে আসন্ন তা তিনি বুঝাতে থাকেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে। সেই সাথে ছিলো তাঁর এমন দৃঢ়োক্তি, ‘আমরা যদি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল না করি ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’ পরিস্থিতিও আসলে তখন সে কথাই বলছিলো; উদ্ভুত এই বাস্তবতার মধ্যে রুশ বাহিনীর বিপুল এক অংশ এসে যোগ দেয় বিপ্লবীদের দলে। প্রলেতারিয়েত শ্রেণি আর এই অগ্রসর সৈনিকেরা মিলেই সংঘটিত করে ২৫ অক্টোবরের অভ্যুত্থান। কেরেনস্কির অস্থায়ী সরকারের অবশেষে পতন ঘটে; রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয় বলশেভিক পার্টি। লেনিনের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র- সোভিয়েত ইউনিয়ন।

এখন এই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই; ৭০ বছরের মধ্যেই সেই বিপুল কর্মযজ্ঞ শেষ হয়ে গেছে। তবে ভাবাদর্শের যে লড়াই সেটা কিন্তু অদ্যাবধি অটুট; মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে মানুষ আপোষ করবে মনে হয় না। অভিজ্ঞতাই যেহেতু মানুষের বড় শিক্ষক, তাই আপাত রুশ বিপ্লবের তাৎপর্যও হলো এখানেই।

– ০৬ নভেম্বর ’১৭

 

এনামুল কবির– লেখক ও কলামিস্ট

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর