Ad Space
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট আগমনের শতবর্ষ

হুসনা আক্তার তন্বী ও খাদিজা আক্তার লিমা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। তারপর থেকেই তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে শিলঙে আসেন। শিলঙে আসার পর সিলেটের ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন সম্পাদক গোবিন্দনারায়ণ সিংহ কবিকে সিলেটে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করেন। দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথের জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রথমে আসতে রাজি হননি। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কবির কাছে একের পর এক আহ্বান পৌঁছালে অবশেষে তিনি সিলেট আসার সম্মতি জানান। তখনও শিলঙ-সিলেট মোটর রাস্তা নির্মিত হয়নি। সাধারণত চেরাপুঞ্জি দিয়ে ‘থাবা’য় করে খাসিয়াদের পিঠে চড়ে আসার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কবি মানুষের পিঠে চড়তে কিছুতেই রাজি হলেন না। কবি বলেছিলেন ‘বরং দশ মাইল হেঁটে পাহাড় উৎরাই করতে পারি তবু মানুষের কাঁধে চড়তে পারবো না।’ তাই চেরাপুঞ্জি রাস্তা না হয়ে গৌহাটি হয়ে রেলপথে সিলেটে আসার পথই তিনি বেছে নেন। সফরসঙ্গী হিসেবে কবির সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্র শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পুত্রবধু শ্রীযুক্তা প্রতিমা দেবী।

১৯১৯ সালের ৩ নভেম্বর আসাম-বেঙ্গল রেলপথ হয়ে কবিগুরু সিলেট রওনা হন। যাত্রাপথে প্রতিটি স্টেশনে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা কবিকে সংবর্ধিত করেন। ৫ নভেম্বর সকালে কবি সিলেট স্টেশনে পৌঁছানোর পর বাজি পুড়িয়ে ও সমবেত জনতার হর্ষধ্বনিতে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্য শ্রীহট্ট মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী, শ্রীহট্টের কৃতি সন্তান আব্দুল করিম, প্রাক্তন মন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ, রায় বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত প্রমুখ স্টেশনে গিয়েছিলেন। সুসজ্জিত বোটে সুরমা নদী পার হয়ে কবি চাঁদনিঘাটে নামেন। সেদিন চাঁদনিঘাট পত্র-পুষ্প পতাকা মঙ্গলঘটে সুসজ্জিত। ঘাটের সবগুলো সিঁড়ি লাল শালুতে মোড়া ছিল। আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মৌলবী আব্দুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি সুসজ্জিত ফিটন গাড়িতে উঠেন। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা তখন গাড়ির ঘোড়া খুলে দিয়ে নিজেরাই গাড়ি টানতে শুরু করল। ব্যাপারটি জানতে পেরে কবি আপত্তি করলেও ছাত্ররা অতি উৎসাহের কারণে তাতে কর্ণপাত করেনি। সিলেট শহরের উত্তর-পূর্বাংশে (বর্তমান কাজিটুলা) একটি ছোট টিলার উপর পাদ্রি টমাস সাহেবের পাশের বাংলোতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। সেখানে প্রাচ্যরীতিতে ‘শঙ্খধ্বনির সঙ্গে মাল্যচন্দন’ দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করা হয়। সেদিনই সন্ধ্যা সাতটায় শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরে উপাসনা করেন রবীন্দ্রনাথ। সমাজের সম্পাদকের অনুরোধে তিনি ‘বীণা বাজাও হে মম অন্তরে/ সজনে, বিজনে, বন্ধু, সুখে-দুঃখে বিপদে/ আনন্দিত তান শুনাও হে মম অন্তরে’- গানটি গেয়ে শুনান।

পরের দিন ৬ নভেম্বর সকাল আটটায় লোকনাথ টাউন হলের প্রাঙ্গনে প্রায় পাঁচ হাজার নরনারীর উপস্থিতিতে জনসাধারণের পক্ষ থেকে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সভার শুরুতেই অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি সৈয়দ আব্দুল মজিদ উর্দু ভাষায় প্রায় দশ মিনিটেরর মতো কবি প্রশস্তি করেন। অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন নগেন্দ্রচন্দ্র দত্ত মহাশয়। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ যে ভাষণটি দেন সেটি ‘বাঙালীর সাধনা’ নামে বাংলা ১৩২৬ ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ছাপা হয়। সভা শেষে দুপুরে কবি অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রীর আমন্ত্রণে তাঁর বাড়িতে যান। সেখান থেকে কবি পুনরায় ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে গেলে মহিলা সমিতি তাঁকে অভিনন্দন জানায়। ‘শ্রীহট্ট মহিলাগণের’ পক্ষ থেকে শ্রীযুক্তা নলিনীবালা চৌধুরী অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন। তিনি মহিলা সমিতির উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জানিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন

মণিপুরিদের বস্ত্রায়ন দক্ষতা, নৃত্যকলা এবং তাদের জীবন যাত্রার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই তাদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি মণিপুরি পল্লি মাছিমপুর পরিদর্শনে যান। কবিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মণিপুরিরা তাদের পল্লির প্রবেশ পথে কলাগাছ পুঁতে কাগজ কাটা ফুল-লতা-পাতা দিয়ে একটি সুন্দর তোরণ নির্মাণ করল। সেখানে মণিপুরি মেয়েদের তাঁত বোনা কাপড় দেখে পছন্দ হওয়ায় তিনি কিছু কাপড় কিনলেন। মণিপুরি ছেলেদের রাখাল নৃত্য দেখার পর সময় স্বল্পতার কারণে তিনি মেয়েদের নাচ রাত্রে দেখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিকাল তিনটায় বাংলোয় ফিরে আসেন। সন্ধ্যা সাতটায় লোকনাথ টাউন হলে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেলা চারটা থেকেই সেখানে জনসমাগমের জন্য সভাস্থলে তিল ধারণেরও জায়গা ছিল না। সাতটার সময় একটা ফিটন গাড়ি করে কবি সভায় এসে পৌঁছলেন। তখন সবাই কবিকে দেখে একসাথে ‘বন্দে মাত্রম’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। সেই সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মতে এই ভাষণটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে উদ্দীপণাপূর্ণ এবং প্রাণস্পর্শী। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটি অনুলিখিত না হওয়ায় কবির এই মূল্যবান বক্তৃতাটি চিরস্থায়ীরূপে রক্ষিত হয়নি।

৭ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধুসহ একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখান থেকে বাংলোয় ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর শ্রীহট্ট কলেজ হোস্টেলে (বর্তমান এম.সি কলেজ) যান। ছাত্ররা শোভাযাত্রা করে তাঁকে সুসজ্জিত সভাম-পে নিয়ে যায়। সভায় প্রায় চার হাজার লোকের মধ্যে অর্ধেকেই ছাত্র। ছাত্রদের অভিনন্দন পত্র পাঠের পর কবি এক ঘন্টাব্যাপী দীর্ঘ যে ভাষণ দেন তার সারমর্ম ‘আকাক্সক্ষা’ নামে পৌষ সংখ্যা ‘শান্তিনিকেতনে’ প্রকাশিত হয়। সভা শেষে রবীন্দ্রনাথ অধ্যক্ষ অপূর্বচন্দ্র দত্তের আমন্ত্রণে তাঁর বাড়িতে যান। সন্ধ্যায় রায় বাহাদুর নগেন্দ্র চৌধুরীর বাস ভবনে এক প্রীতি সম্মেলনে যোগ দেন। যে মণিপুরি নাচটি তিনি সময়ের অভাবে মাছিমপুরে দেখতে পারেননি বাংলোয় ফিরে এসে মণিপুরি নৃত্যশিল্পীদের দ্বারা সেই নাচটি উপভোগ করেন। মণিপুরি নৃত্য নৈপুণ্যে কবি মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে মণিপুরি নৃত্য স্থান পায়। সিলেট থেকে ফেরার সময় ত্রিপুরায় গিয়ে সেখান থেকে একজন মণিপুরি নৃত্যশিক্ষককে তিনি আশ্রমে নিয়ে যান। ৮ নভেম্বর সিলেট ভ্রমণের পরিসমাপ্তি ঘটে রবীন্দ্রনাথের। আবার ‘অন্য কোনোখানে’ যাত্রা শুরু করেন তিনি। সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ব্যপ্ত কর্মসূচি প্রাণ পেয়েছিল কবি সিলেটবাসীর ‘হৃদয় দিয়ে আদর’ পেয়েছিলেন বলেই। তাই বিশেষ আদরের প্রতি উপহার দিয়েছিলেন ‘খুব কষে’ তাঁর ‘মনের কথা’ শুনিয়ে। সেই কথাগুলোই উঠে এসেছে তাঁর ‘বাঙালীর সাধনা।’ ও ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতায়।

বাঙালীর সাধনা : এই বক্তৃতায় তিনি বলেন ভারতবর্ষে বাঙালির একটি বিশেষ সাধনা হচ্ছে নতুনকে আঁকড়ে ধরার সাধনা। বাংলার সকল মহাপুরুষই নতুনকে অভ্যর্থনা জানাতে কখনও ভয় পায়নি। এই নতুন আশার, এই নতুন প্রাণের সঞ্চার এদেশের সাহিত্যে, সমাজে ও শিক্ষা-দীক্ষায় প্রবেশ করেছে। যে মানুষ পুরাতনকে একান্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে সে নিজেকে অবিশ্বাস করে। আর যে নিজেকে অবিশ্বাস করে তার চিত্তের বিকাশ কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু বাঙালি জাতি নিজেকে বিশ্বাস করে। এই আত্মশক্তির উপলব্ধিই তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে নিয়ে যাবে। ‘সেই শক্তিই শ্রেষ্ঠ শক্তি যে শক্তি থেকে সৃষ্টি হয়।’

আমাদের দেশে জাপান ও ইংল্যাণ্ডের  মতো জাতিগত সহজ ঐক্য নেই। আমাদের ভাষার এবং ধর্মের আচারের মধ্যে বৈচিত্র্য এবং বিরোধ রয়েছে। মূলত আমাদের মধ্যে আত্মার বন্ধন নেই যে বন্ধন সব বিভেদকে দূর করে সকলকে এক করে দেয়। তিনি মনে করেন একমাত্র আত্মাই আপন আনন্দে আপন প্রেমে সমস্ত বিভিন্নতা ও বিচ্ছেদকে অতিক্রম করতে পারে। ‘বিভেদ যেখনে বিভেদ-রূপেই রয়ে গেছে বোঝা যায় আত্মা সেখানে আপন সিংহাসন গ্রহণ করে নি।’

আমাদের ধর্ম-ভাষার মধ্যে নানা বৈচিত্র্য থাকায় আমরা সবাইকে এক বলে ভাবতে পারি না। তবে অনেকে বলে ব্যবসা-বাণিজ্যের মিলনে কিংবা রাষ্ট্রনৈতিক আন্দোলনে আমাদের দেশে একতা ঘটবে। কিন্তু তিনি এর বিরোধিতা করে বলেছেন বিষয়বুদ্ধির দ্বারা যে মিলন ঘটে সে মিলন ক্ষণস্থায়ী হয়। কেননা মিলনের প্রয়োজন চলে গেলে সম্বন্ধও ছুটে যায়। বস্তুত মিলনের ক্ষেত্রে আত্মিক মিলন হওয়া দরকার যেখানে কোন লাভ-লোকসানের হিসেব থাকবে না। মূলত এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কেননা একতা ছাড়া বাঙালির জাতীয় সঙ্কট নিরসন সম্ভব নয়। আমাদের দেশে যে অভাব, অনটন ও দারিদ্র্যতা রয়েছে তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে পররাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভরশীলতা অর্জন প্রয়োজন।

আকাঙ্ক্ষা : রবীন্দ্রনাথ তাঁর এ বক্তৃতার মধ্য দিয়ে নবীনদের জাগাতে চেয়েছেন। কেননা তারাই পারবে পুরাতন পৃথিবীর জীর্ণতা, ব্যর্থতা, কদর্যতাকে ঘুচিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে বসবাসের যোগ্য করে তুলতে। আর তরুণদের এই জাগরণের জন্য প্রয়োজন সমাজের মানুষদের সহানুভূতি ও ভালোবাসা। তারা যদি পয়ষট্টি বছরেও নিজেদের আসন পাকা করে রাখে তাহলে তরুণ দল কিভাবে সমাজে স্থান পাবে ? রবীন্দ্রনাথ মনে করেন সমাজের, দেশের, রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য আমাদের উচিৎ নতুনকে আহ্বান করা, তাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া। তিনি নবীনদের আহ্বান করেছেন তারা যেন সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে নতুন উদ্যোমে সামনে এগিয়ে যায়। তাদের হাতেই পৃথিবীর ভার পড়েছে। তারা সব ধরনের জীর্ণতা, কদর্যতা পরিষ্কার করে চলার পথকে কণ্টকমুক্ত রাখবে। এর জন্য দরকার হলো শিক্ষা। শিক্ষাই পারে তাদের ভেতরের সংকীর্ণতাকে পরিহার করে মনুষ্যত্ববোধকে জাগিয়ে তুলতে। তাই প্রত্যেক ছাত্রের ‘মহৎ আকাক্সক্ষা’ হওয়া উচিৎ কিভাবে পুরোপুরি মানুষ হওয়া যায়। যে শিক্ষা কোনো পুঁথির শিক্ষা বা ক্ষুদ্র শিক্ষা নয়Ñ এটা মনুষ্যত্বের শিক্ষা। ‘মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা তার সমস্তই তার অধীনে। এই মনুষ্যত্ব হচ্ছে আকাক্সক্ষার ঔদার্য্য আকাক্সক্ষার দুঃসাধ্য অধ্যবসায়, মহৎ সঙ্কল্পের দুর্জ্জয়তা।’

কেবল নোটবুক মুখস্ত করে কিংবা পরীক্ষা পাসের জন্য টেক্সট বইয়ের পাতা উল্টালে প্রকৃত বিদ্যা অর্জিত হয় না। ছাত্রদেরকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেদের আত্মা ও মনকে বিকশিত করতে হবে। মূলত আমাদের যে দারিদ্র্র্য তা আত্মারই দারিদ্র্য। ‘অন্য দারিদ্র্যের লজ্জা নেই কিন্তু আকাক্সক্ষার দারিদ্র্যের মত লজ্জার কথা মানুষের পক্ষে আর কিছুই নেই। কেননা, অন্য দারিদ্র্য বাহিরের, এই আকাক্সক্ষার দারিদ্র্য আত্মার।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের কথা বলেছেন। যে শিক্ষার লক্ষ্য কেবলমাত্র দারোগাগিরি আর কেরানিগিরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ ও জাতির মুক্তি সম্ভব।

শ্রীভূমি: সিলেটের ভ্রমণের কয়েক বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট নিয়ে ‘শ্রীভূমি’ নামে একটি কবিতা লেখেন। সিলেটে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের বসবাস। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে শ্রীহট্ট তথা সিলেট ও কাছাড়কে আসাম প্রদেশভুক্ত করা হয়েছিল। এই দুই জেলাকে বঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রায়ই আলোচনা করা হতো। অনেকেই ধারণা করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উক্ত পরিপ্রেক্ষিতেই ‘শ্রীভূমি’ কবিতাটি রচনা করেন। কিন্তু উল্লেখ করা দরকার যে, এই কবিতাটিও তাঁর রচনাবলিতে নেই।

‌‌‘মমতাবিহীন কালস্রোত
বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি
সুন্দরী শ্রীভূমি।
ভারতী আপন পুণ্য হাতে
বাঙালির হৃদয়ের সাথে
বাণীমাল্য দিয়া
বাঁধে তব হিয়া।
সে বাঁধনে চিরদিনতরে তব কাছে
বাঙলার আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।’

১৯১৯ সাল হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটা বছর। এই সময় জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে ইংরেজ সেনানায়ক বিগ্রেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে ভারতবর্ষের নিরস্ত্র জনগণের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজদের এই ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন, যে উপাধি তিনিই প্রথম বাঙালিদের মধ্যে পেয়েছিলেন। এরপর থেকে কবি যেখানেই বক্তৃতা দিয়েছেন সেখানেই বাঙালির আকাক্সক্ষাকে বৃহৎ করার বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন। স্বদেশবাসীর উপর এই অন্যায়, অবিচার ও নির্মম হত্যাকা-কে কবি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাই বিভিন্ন জায়গায় সভা-সেমিনারের মাধ্যমে তিনি ভারতবাসীর চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। কেননা কবি মনে করেন স্বদেশবাসীর জাগরণ ছাড়া তাদের মুক্তি সম্ভব নয়। কবির এ মানবিকতার পরিচয় উঠে এসেছে সিলেট ভ্রমণকালে কবির বক্তৃতা ‘আকাক্সক্ষা’ ও ‘বাঙালীর সাধনা’য়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে মূলত বাঙালি জাতিকে পররাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আর এর জন্য প্রয়োজন নোটনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন। যে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতবাসী তাদের আত্মা ও মনকে সুগঠিত করতে পারবে। শতবর্ষ আগে তিনি স্বদেশভূমির উন্নয়ন নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সে স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। মূলত ‘আকাক্সক্ষা’ ও ‘বাঙালীর সাধনা’ বক্তৃতায় আমাদের দেশ ও জাতি গঠনে প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর যে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে আমরা এখনও তা ধারণ করতে পারিনি। উল্লেখ্য যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট আগমন শতবর্ষে পদার্পণ করলেও তাঁর স্মৃতিচিহ্নকে ধরে রাখার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতাগুলো প্রচার ও প্রসারেরও ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। কেবলমাত্র ‘কবি প্রণাম’ ও ‘পূর্বাশা’ পত্রিকায় কবির বক্তৃতা দুটি প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া ২০১৮ সালে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত সিলেটের মাছিমপুর মণিপুরি পল্লীতে তাঁর একটি আবক্ষমূর্তি নির্মিত হয়।