আইন-আদালত, লিড নিউজ



দেশদর্পণ ডেস্ক

১৬ নভেম্বর ২০১৭, ১:৪৮ অপরাহ্ণ




‘ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে’

দেশদর্পণ ডেস্ক :: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা কোনো মামলারই আইনগত ভিত্তি নেই। রাজনীতিতে সক্রিয় অবস্থানের কারণেই তার বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) পুরান ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী ৫নং বিশেষ জজ আখতারুজ্জামানের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় বিএনপি চেয়ারপারসন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় টানা পঞ্চমবারের মতো বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোনো মামলারই আইনগত ভিত্তি নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এসব মামলা করা হয়েছে। কারণ আমি রাজনীতিতে সক্রিয়, যা ক্ষমতাসীনদের জন্য চ্যালেঞ্জ।’

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির ভাগ্যেই যদি এই হয়, সেখানে অন্য বিচারপতিদের সামনে ন্যায় বিচারের সুযোগ ও পরিবেশ কতটা থাকতে পারে? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি জনগণের আস্থাই কতটা থাকবে?’

আদালতে দেওয়া খালেদা জিয়ার লিখিত বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

মাননীয় আদালত,
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান তার বিভিন্ন অবদান ও ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও ব্যাপক প্রসংশিত ছিলেন।
বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আমি এ মামলার বিবরণ থেকে জেনেছি এবং কুয়েত দূতাবাসের চিঠিতে জানানো হয়েছে যে, জিয়াউর রহমানের নামে এতিমখানা স্থাপনের জন্য তারা অনুদান দিয়েছিল। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এস.এম মোস্তাফিজুর রহমান এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন এবং তিনিই সবকিছু জানতেন।
এ মামলার বিবরণ থেকে আমি আরও জেনেছি যে, কুয়েতের দেওয়া অনুদানের অর্থ দুইভাগ করে দুটি ট্রাস্টকে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়নি এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার কিংবা অন্য কারও কোনোভাবে লাভবান হবার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি।
ট্রাস্ট দু’টির কোনোটিতেই আমি কোনো পদে কখনও ছিলাম না এবং এখনও নেই। অনুদানের অর্থ আনা বা বিতরণের সঙ্গেও ব্যক্তিগতভাবে বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বাগেরহাটে অনুদানের টাকায় ট্রাস্টের মাধ্যমে স্থাপিত এতিমখানা সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই ট্রাস্ট সম্পর্কে কোনো অভিযোগও নেই।
মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে আমি আরও জানতে পেরেছি যে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টটি বগুড়ায় এতিমখানা স্থাপনের লক্ষ্যে সেখানে জমি ক্রয় করে। এই জমি কেনা সম্পর্কেও কোনো রকম অনিয়মের অভিযোগ নেই। এই ট্রাস্টের বাকি টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে এবং তা সুদাসলে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট একটি বেসরকারি ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টটি আইন সম্মতভাবে নিবন্ধিত এবং ট্রাস্টের ডিড অনুযায়ী দেশের ট্রাস্ট আইনে পরিচালিত। ট্রাস্টের কেউ সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নন।
ট্রাস্টের কেউ কোনো অনিয়ম বা আইনের লঙ্ঘন করলে সে ব্যাপারে ট্রাস্ট আইনে অভিযোগ বা মামলা হতে পারে। কিন্তু, দুর্নীতি দমন কমিশন কিভাবে ট্রাস্টের কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে মামলা রুজু করে? এটা কি তাদের আওতা ও এখতিয়ারের ভেতরে পড়ে? তাছাড়া এখানে কোনো রকম দুর্নীতিও হয়নি। এই মামলায় আমাকে কেন অভিযুক্ত করা হয়েছে তাও আমার বোধগম্য নয়।

মাননীয় আদালত,
আমার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার যে, এর প্রতিটি মামলাই আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে। সবগুলো মামলাই করা হয়েছে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা কোনো মামলারই কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আমি রাজনীতিতে সক্রিয় বলেই এবং আমাকে ক্ষমতাসীনদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করেই এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।
অথচ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়েও জনগণ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়েই তারা এসব মিথ্যা মামলার আশ্রয় নিয়েছে। এসব মামলা দায়েরের উদ্দেশ্যই হচ্ছে আমাকে হেনস্তা করা এবং জনগণের সামনে হেয় করা। কিন্তু, তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি এবং হবেও না ইনশআল্লাহ। বরং এসব করে তারাই জনগণের কাছে হেয় হচ্ছে এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
কারণ এদেশের মানুষ অনেক সচেতন এবং তারা সত্য ও মিথ্যার ফারাক সহজেই বুঝতে পারে। তাই আমাদের যত বেশি মামলায় জর্জরিত করা হচ্ছে আমরা ততো বেশি দেশবাসীর সহানুভূতি ও সমর্থন পাচ্ছি। জনগণ আরও বেশি করে আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
মাননীয় আদালত,
সে কারণেই আমরা অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগে দায়ের করা মামলা-মোকদ্দমায় মোটেই ভীত নই। তবে দেশবাসী ও আমাদের আশঙ্কার কারণ অন্য জায়গায়। সেটা হচ্ছে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ন্যাক্কারজনকভাবে দেশ থেকে ন্যায়বিচারের পরিবেশ ও সুযোগ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। শাসক মহল তাদের এই অপকর্মে ও এই অসদুদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সব রকমের কারসাজির আশ্রয় গ্রহণ করেছে। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। সে কারণে অনেকেই বলছেন, শাসক মহলের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে দেশে এখন ন্যায়বিচারের বদলে সৃষ্টি হয়েছে ‘নাই বিচারের’ পরিবেশ। অর্থাৎ দেশে সুবিচার ও ন্যায়বিচারের কোনো সুযোগ ও পরিবেশ আজ আর নেই।
মাননীয় আদালত,
মাজদার হোসেন মামলার আলোকে সংশ্লিষ্ট সকলে এবং আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাহী বিভাগের আওতা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে সত্যিকারের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা কায়েম হবে। কিন্তু, আমাদের সকলের সে আশা চরমভাবে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। আমরা কী দেখতে পেলাম? সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও আজও নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন করা হয়নি। এর ফলে নিন্ম আদালতগুলো আইন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবমুক্ত হয়নি।
বরং সাম্প্রতিক কিছু ন্যক্কারজনক ঘটনায় এই আদালতগুলোর ওপর শাসক মহলের রাজনৈতিক চাপ ও কর্তৃত্ব আরও বেড়েছে। ন্যায়বিচারের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি কী ধরনের ন্যক্কারজনক ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, আপনি নিশ্চয়ই তা অবগত রয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে আসীন প্রধান বিচারপতিকে কী ধরনের পরিণতির শিকার হতে হয়েছে তা সকলেই জানেন। সংবাদ-মাধ্যমের এখন কোনো স্বাধীনতা নেই।
ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ার ভয়ে তারা সত্য সংবাদ অবাধে প্রকাশ করার সাহস পায় না। তা সত্ত্বেও যতটুকু খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে পেরেছে তাতেই বুঝা গেছে যে, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে তার পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেওয়া থেকেই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের অপতৎপরতা শুরু হয়। শাসক মহল তাদের ক্রোধ ও ক্ষোভ গোপন রাখতে পারেনি। তারা প্রকাশ্যেই প্রধান বিচারপতিকে নানা রকম হুমকি দিয়ে আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে শুরু করে। সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার অপরাধে তাকে পদত্যাগ করে চলে যেতে বলা হয়।
বিচারপতি সিনহা আত্মপক্ষ সমর্থনে বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিয়েও ক্ষমতাসীনদের ক্রোধ প্রশমিত করতে পারেননি। তাকে কয়েকদিন প্রধান বিচারপতির বাসভবনে প্রায় অন্তরীণ ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটাতে হয়। এরপর সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়, বিচারপতি সিনহা অসুস্থ এবং তিনি বিদেশে যাওয়ার জন্য ছুটি নিয়েছেন।
কিন্তু, মাননীয় আদালত আপনি জানেন, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়া যাবার আগে সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীকে সুস্পষ্টভাষায় জানিয়ে যান যে, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ইদানিং একটি রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তিনি বলে গিয়েছিলেন, ছুটি শেষে তিনি ফিরে আসবেন এবং দায়িত্বে যোগ দেবেন। কিন্তু, এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল বললেন, ছুটিতে যাওয়া প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ফিরে এসে স্বপদে বসা সুদূর পরাহত। তার এ বক্তব্যে সরকারের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে এবং তার কথাই বাস্তবায়িত হয়। আমরা সংবাদপত্র ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনেছি যে, প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় এসকে সিনহাকে অসুস্থ ঘোষণা করে ন্যক্কারজনকভাবে জোর করে ছুটিতে এবং দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে দেশে না ফিরে পদত্যাগ করতে তাকে বিশেষ পন্থায় বাধ্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পছন্দ মাফিক রায় না দেওয়ার কারণে দেশের প্রধান বিচারপতিকে যেখানে এমন ভাগ্য বরণ করতে হয়, সেখানে অন্য বিচাররকদের সামনে ন্যায়বিচারের সুযোগ ও পরিবেশ কি আর থাকতে পারে? এই পরিস্থিতিতে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের কতটা আস্থা থাকতে পারে মাননীয় আদালত আপনি সেটা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন। ক্ষমতাসীনরা এই সেদিনও ফেনীতে আমার মোটর বহরে হামলা চালিয়েছে।
আমার বিরুদ্ধে তাদের অপপ্রচার, হুমকি এবং মামলা নিয়ে আদালত অবমাননাকর বক্তব্য অব্যাহত আছে। এসবেও আমি ভীত নই। আমার আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে, দেশে ন্যায়বিচারের পরিবেশ ও সুযোগ তারা ধ্বংস করে দিয়েছে। কাজেই আদালতের কাছে আমি ন্যায়বিচার পাব কি না সেই সংশয় নিয়েই এই মামলায় আমাকে অত্র জবানবন্দি দিতে হচ্ছে।
মাননীয় আদালত,
আমার বিরুদ্ধে বিচারাধীন বর্তমান মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ এবং প্রিভেনশন অফ কোরাপশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। উভয় আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি নিশ্চিতভাবে একজন পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে বিবেচিত হন কেবল তখনই তিনি কোনো দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারেন। আমি সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার বিরুদ্ধে কোনো কথিত অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে আমি একজন পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হতে পারি না।
বর্তমান মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তা কর্তৃক অনুসন্ধান, তদন্ত ও চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং তারাই মামলার বিচারের জন্য অনুমোদনপত্র দিয়েছেন। এই মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে কার ইঙ্গিতে, কার উদ্যোগে, কার অভিযোগে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। অর্থাৎ গোপন করা হয়েছে। এই মামলাটি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে বর্ণনা দিয়ে ওই তহবিল তছরূপ সংক্রান্ত একটি মামলা। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণে দুদকের সাক্ষীরা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা কোনো কর্তৃপক্ষ এই মামলা দায়েরের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।
একইভাবে সংবিধান স্বীকৃত মতে ১২৭ ও ১২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মহাহিসাব নিরীক্ষকের দফতর থেকে কোনোরূপ অডিট, নিরীক্ষা, আপত্তির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কথিত এতিম তহবিলের টাকা তছরূপেরও কোনো অভিযোগ নেই। মামলার বিবরণে এটা স্বীকৃত যে, প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে কোনো তহবিল কখনও কোনো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকালে খোলা হয়েছে বা ছিল অথবা কোনো প্রাপ্তি কোনো মহল থেকে কখনও গৃহিত বা প্রদান করা হয়েছে কখনও এরূপ কোনো বক্তব্য এই মামলায় কোনো সাক্ষী দিতে পারেনি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কথিত এতিম তহবিলে প্রারম্ভিক কী স্থিতি ছিল অথবা কোনো পর্যায়ে সংযোজন বা বিয়োজন পর কী স্থিতি ছিল এরূপ কোনো বক্তব্য কোনো সাক্ষী বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপন করেন নাই।
প্রধানমন্ত্রীর দফতরে লিখিতভাবে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো হিসাবপত্র বা ডকুমেন্ট, বিদেশ থেকে অনুদান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে প্রাপ্তি সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট রেজিস্টার দুদকের প্রথম অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পি.ডব্লিউ-৩২ কে দেওয়া হয় নাই। পি.ডব্লিউ-৩২ অর্থাৎ এ মামলার প্রথম অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা তার অনুসন্ধান পরবর্তীতে যে অনুসন্ধান রিপোর্ট দাখিল করেছেন সেখানে একজন অভিযুক্ত হিসেবে আমি তালিকাভুক্ত ছিলাম না বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ও সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই পি.ডব্লিউ-৩২ তার সাক্ষ্যে বলেন, তিনি আমার বিরুদ্ধে অনুরূপ কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পান নাই বলে তার অনুসন্ধান রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তার অনুসন্ধানের বিষয় ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, বাগেরহাট। তিনি জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বিষয়ে কোনো আত্মসাতের অভিযোগ পাননি বলে রিপোর্ট প্রদান করেন।
পি.ডব্লিউ-৩২ বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট একটি প্রাইভেট ট্রাস্ট এবং এখানে এতদংসক্রান্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ৪০৬/১০৯ ধারার অপরাধ হতে পারে মর্মে বর্ণনা ও তার সাক্ষ্য দান করেছেন। এই মামলাটিতে দ্বিতীয় অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পি.ডব্লিউ-৩১। তিনি পি.ডব্লিউ-৩২ এর অধস্তন একজন সহকারী ডাইরেক্টর বলে পি.ডব্লিউ-৩২-এর সাক্ষ্য দৃষ্টিতে দেখা যায়। তার অনুসন্ধানকালীন সময়ে তার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লোকমান হোসেন মামলার তদারকিতে নিয়োজিত ছিলেন। পি.ডব্লিউ-৩২ এর অনুসন্ধান রিপোর্ট দুদক-এর ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য এই মর্মে কোনো বক্তব্য সাক্ষ্য-প্রমাণে আসে নাই। বরং সহকারী ডাইরেক্টর পি.ডব্লিউ-৩১ তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পি.ডব্লিউ-৩২-এর প্রণীত অনুসন্ধান রিপোর্টের কিছু অংশ সংযোজন ও পরিবর্ধন করে আমাকে এই মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে রিপোর্ট প্রদান করেন। এ রিপোর্ট প্রদান করতে তিনি মাত্র দুই সপ্তাহ সময় নেন।

আজকে আর পড়তে পারছি না, চোখে সমস্যা হচ্ছে- বলে সময় নেন খালেদা জিয়া। এরপর আদালত আগামী ২৩ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন।
এদিন বেলা ১১টা ৪৯ মিনিট থেকে ১২টা থেকে ৫৪ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য পাঠের পর মুলতবির আবেদন জানান খালেদা জিয়া। এর আগে গত ১৯ অক্টোবর প্রথম দিনের বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। এই নিয়ে এই মামলায় খালেদা জিয়া ষষ্ঠবারের মতো আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেন। বিদেশ যাওয়ার আগে একবার তিনি একই মামলায় বক্তব্য উপস্থান করেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে আদালতে এসে একই সঙ্গে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও হাজিরা দেন খালেদা জিয়া। আর দুপুর একটার দিকে আদালত ত্যাগ করেন তিনি।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ওই দুই দুর্নীতি মামলার বিচার চলছে এ আদালতে।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক।
২০১০ সালের ৫ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন— মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল (ইকোনো কামাল), ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

সূত্র : পরিবর্তন ডটকম

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর