মতামত



দেশদর্পণ ডেস্ক

৩০ মার্চ ২০১৮, ১০:২৫ অপরাহ্ণ




ভুবন ডাঙায় এক মাসুম

উজ্জ্বল মেহেদী
মধ্যবিত্ত পরিবারে শাসন-অনুশাসন যেন এসএসসি পরীক্ষার পর অবসান ঘটে। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফল পেতে ছয় মাস। অখণ্ড অবসর। কিন্তু সেই সময়ে ব্যস্ত। সংবাদপত্রের চিঠিপত্র বিভাগে লিখত। সামাজিক সমস্যা নিয়ে অনেকগুলো লেখা বাংলাবাজার পত্রিকায় ছাপা হয়। এগুলো একটি খাতায় অাঁটা দিয়ে লাগানো। একদিন আমার কাছে নিয়ে এল। আমি চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু কী, এগুলো না পড়ে তার যত্ন-সংগ্রহ দেখ মুগ্ধ।
কী লিখেছি, এর চেয়ে কোনো কোনো সময় কিভাবে লিখেছি, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ জন্য আমি হাতের লেখা সুন্দর ও পরিপাটির পক্ষপাতি। আমার ভাবনার প্রতিফলন আমার অগোচরে একজন করছে জেনে কাছে টেনে নিলাম।
মাসুম তার নাম। আবু সালেহ মোহাম্মদ মাসুম। নামের ওপর করাত চালিয়ে বানালাম আ স ম মাসুম!

আঠারোর তারুণ্য তার। চলাফেরা, যুক্ত-তর্ক-গল্প সবই সম নয়, অসম বয়সীদের সঙ্গে। আমি, আমার সিনিয়র, সিনিয়র থেকে সিনিয়র-সবাই মাসুমময়। সুনামগঞ্জে এক সময় আমার সাংবাদিকতা আমাকে বন্ধুহীন করে ফেলেছিল। বিভক্তি রেখার মধ্যে ছিলেন সবাই। মাসুম ছিল অবিচল। অনেক বড় বড় কাজ, অনেক ভালো কাজ, অনেক সাহসী কাজ আমি মাসুমকে নিয়ে সেরেছি। যেমন, টাঙ্গুয়ার হাওর। আমি লিখছি তো লিখছি, মাসুম আশপাশের অভিজ্ঞান এনে দিচ্ছে। এমন কি একদিন বরুণ রায়ের কাছে গিয়েও টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষিত থাকার পক্ষে জনমত প্রতিষ্ঠা করে এল। বরুণ রায় আমার পক্ষ মানে প্রথম আলোয় একের পর এক প্রতিবেদন পড়ে পড়ে একদিন জেলা প্রশাসনের মতবিনিময় সভায় মতামত দিয়েছিলেন। টাঙ্গুয়ার হাওরের ইজারাদারি বাতিল করতে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ইউ মাস্ট গো…’।

মাসুম পরিবারের একমাত্র ছেলেসন্তান। এমনটি হলে সব পরিবারেরই চাওয়া থাকে ছেলে যেন বাড়িতে থাকে। মাসুম যখন সুনামগঞ্জ সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন একদিন তার বাবা (প্রয়াত) আমার কাছে এলেন। ছেলেকে নিয়ে যারপরনাই খুশি তিনি। দলিললেখক সমিতির নেতা ছিলেন। এক নামে শহর-গ্রমে পরিচিতি ছিল তাঁর। স্বগোগক্তি করে বললেন, ‘এমন সব জায়গায় ছেলের উঠাবসা, চলাফেরা যে, আমি নিজের পরিচয় বাদ দিয়ে মাসুমের বাবা বলে আলাদা সমীহ পাই!’
ওই দিন যে কথাটি তিনি বলেছিলেন, সেটি নিতান্তই পারিবারিক। শুনে আমিও সিদ্ধান্ত নিই। মাসুম যাতে সুনামগঞ্জ স্থির থাকে, সেই ব্যবস্থা করা। একসময় ভাবি, মাসুম তো আমার বিকল্প হয়ে গেছে, আমি না হয় সুনামগঞ্জ ত্যাগ করি। ভাবনা ছিল ঢাকায় যাওয়ার। আর মাসুমকে দিয়ে যাবো প্রথম আলোর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিত্ব। হয়তো এটি টের পেয়েছিল। আগেই উড়াল দিল। সিলেট গেল মাসুম, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি চ্যানেলের প্রযোজক হয়ে। আমি আশাহত। তার বাবার মুখোমুখি হতে এক ধরণের দ্বিধা কাজ করতো। নিজের জায়গা ছাড়তে কেন আমি সিদ্ধান্ত দ্রুত নিলাম না!

সুনামগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তসীমার মহল্লা মুহাম্মদপুর আমার বাসা। মুহাম্মদপুরে জালালাবাদ গ্যাসের আঞ্চলিক কার্যালয়। সুবিশাল এই দপ্তর পার হলেই মাসুমের বাসা। বলাকা অাবাসিক এলাকা। তাদের বাসার নাম ‘ক্ষণিকের নীড়’। মনে মনে সান্ত্বনা এখানেই খুঁজি। এই যদি হয় বাসার নাম, তাহলে এই বাসা বা এই পরিবার মাসুমকে কী করে আর ধরে রাখবে? মাসুম তো পেশায়-নেশায় বৈরাগ্য বরণ করবেই।
আমার পেশার নোঙর সিলেট হচ্ছে। এ বিষয়টি সিলেটে থেকে আগেই বুঝে ফেলেছিল মাসুম। আমার জায়গা কাকে দেই? মাসুমকে বললাম। মনে মনে ভাবছিলাম, যদি সে ফিরে যায়, তাহলে তো হলোই। আবার ভাবি, যে পাখি ঘর থেকে একবার বের হয়, সে তো আর ঘরে ফিরে না, ফেরানো যায়-ও না।
এখন সুনামগঞ্জে আমার স্থলাভিষিক্ত খলিল রহমান। তখন মাসুম একবাক্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিল। আমারও মনে ছিল তাই, মিলল। ২০০৬ সালের আগষ্ট মাস থেকে সিলেটে আছি। প্রথম ভরসা মাসুম। সিলেট থেকে অামার কাজের উপর, আমার ভাবমূর্তির দিকে অসম্ভব নজর রাখতো মাসুম। কিন্তু আমাকে বুঝতেও দিত না। সিলেট এসেও মাসুমকে আমি বেশি দিন পেলাম না। এবার পৃথিবীর পথে পা বাড়াল মাসুম।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও… প্রবচনের মতো। মাসুম সবকিছু ছাড়িয়ে সেই একই জগৎ নিয়ে পড়ে থাকল। সময়ের পালাবদলে একের পর এক পালক যুক্ত করে এগোল। একদিন একটি বইয়ে একটি কবিতা দেখলাম। তাতে আমাকে সে একটি কবিতা উৎসর্গ করেছে, আমি তার কাছে সম্মোহিত হয়েছি ‘গুরু’ বলে। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। মাসুমকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারিনি। কিন্তু কখনো মাসুমকে আমি ‘শিষ্য’ ভাবতে পারিনি। একবারের জন্যও না। ভাবতাম, আমার কোনো সত্ত্বা সে। সুনামগঞ্জ ছেড়ে আসার পর অসম্ভব শূন্যতার মধ্যে পড়েছিলাম। আবার সিলেট এসে যাপিত ব্যস্ততায় ছিল মাসুমশূন্যতা। আমি তাকে তো দূরের কথা, কাউকে বলিনি এসব কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, মাসুমকে কোনো কথা না বললেও সে বুঝে নিত আমার মনের কথা। এ জন্য ‘গুরু’ ভক্তি।

মাসুম আজ সাত সমুদ্রের ওপারে। অনেক কিছুই তার হাত ধরে হয়েছে। যা অাগে কেউ করে দেখাতে পারেনি। যুদ্ধ প্রতিবেদন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ কাঠামাণ্ডু ঘুরে ঘুরে প্রতিবেদন, সেবা মনোব্রতী, মানবতাবাদী মন তাকে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীময়। সর্বশেষ একটি অর্জন, একজন বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ জনের একটি শক্তিশালী তালিকায় স্থান মাসুমের।
কতটা খুশির সে খবর, ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার থাকল না। তার আম্মা মারা গেলেন এই কয়দিন হয়। বাবা আরও অাগে চলে গেছেন। এই অর্জন, তাঁদের কতটা তুষ্ঠ করতো, মাসুমকে গড়ার সূত্রধর এই আমি আজ কায়মনোবাক্যে অনুভব করতে পারছি।
আমি বিমোহিত মাসুম। মোহিত মন বিমোহিত হলে কিছুই বলার থাকে না। ‘ক্ষণিকের নীড়’ থেকে পৃথিবীর পথে হাঁটতে থাকো, ভালো থেকো সবসময়।

 

লেখক- সিলেট ব্যুরো প্রধান, দৈনিক প্রথম আলো