সোশ্যাল মিডিয়া



দেশদর্পণ ডেস্ক

২২ মার্চ ২০১৮, ৬:৩৫ অপরাহ্ণ




পূর্ণতায় পাড়ি, ভালো থেকো বিবি

উজ্জ্বল মেহেদী
ছোটবেলার কথা। বাসায় বাসায় কাজ করতেন চল্লিশোর্ধ এক নারী। ‘সুশিলা’ বলে ডাকতাম। বোঝদার হওয়ার পর ভাবনার উদ্রেক ঘটে। মধ্যবয়সী একজন নারীকে কেন নাম ধরে ডাকি? আম্মাকে প্রশ্ন করতেই বললেন, সবাই ডাকে, তুমি না হয় ‘বিবি’ বলে ডেকো।

বিবি মানে বোন। গ্রাম এলাকায় নানি, দাদি সম্পর্কের আত্মীয়দের এ নামে ডাকা হয়। ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাস (সঠিক তারিখটি নোটে আছে, যখন লিখছি, ঠিকঠাক মনে নেই)। কেতাদূরস্ত একজন নারীকে সামনে এনে দিলেন খসরু ভাই (মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু)।তাঁকে দেখে চিনলাম। আমার আব্বার নাম বলতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। বললেন, ‘তুই ডাক্তারের পুয়া! কত গেছি তোরার বাসাত!’

যাক, কথা এটা নয়। কথা হলো মুক্তিযু্দ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা লোক্কায়িত। মস্ত বীরত্বগাথা। শুনতে আর লিখতে গিয়ে আমার সুশিলার কথা মনে পড়ে গেল। আম্মার কাছে খোঁজ নিতে গিয়ে জানালাম, মারা গেছেন ছোটবেলার সেই ‘বিবি’। তিন কূলে তাঁর কেউ নেই। তাই কোথায় মারা গেছেন, দাফন কোথায় হয়েছে, সেই সবের কিছুই জানার সুযোগ ছিল না। আম্মার মুখে সুশিলার জীবনের অজানা একটি অধ্যায় জানলাম। শুনে তো থ বনে গেলাম। সামাজিকতার কারণে সবাই চেপে রেখেছিলেন। সুশিলা নামের সেই নারী ছিলেন একজন বীরঙ্গনা।

আমাদের জার্নাল সময়ের সূচনায় খসরু ভাই এক পরম পাওয়া। অভিভাবকতুল্য। সাংবাদিকতার সিঁড়ি বেয়ে যাপিত ব্যস্ততার অাইন পেশায়। তবু আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।কোন খবর কে ব্রেক করবে, কখন করবে, সবই জানা। ওই নারীকে মুখোমুখি করার ব্যবস্থা করে দিয়ে বললেন, সামনে ডিসেম্বর মাস আসছে। ওকে নিয়ে রিপোর্ট করতে পারো।

পিংকুদা (রণেন্দ্র তালুকদার, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, সংবাদ-এর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন তখন), পংকজ দা (পংকজ কান্তি দে, তখন মুক্তকণ্ঠ প্রতিনিধি), খলিল রহমান (ছাত্র ইউনিয়নের কলেজ শাখার নেতা হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক একতা’য় খবর পাঠানোর সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতো) ও আমি (তখন ভোরের কাগজ প্রতিনিধি) পর্যায়ক্রমে মুখোমুখি হই ওই নারীর। নাম নূরজাহান বেগম। ডাক নাম কাকন। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা সব শেষ। রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর (সুনামগঞ্জে সমমনা সাংবাদিকদের মধ্যে টিমওয়ার্ক রিপোটিং তখন এমনই ছিল, একজন রিপোর্টের খসড়া তৈরি করতো, বলা হতো স্ক্রিপ্ট। পরে যার যার মতো করে অথবা পত্রিকার নিজস্ব সম্পদকীয় নীতি অনুসারে লিখতেন)।

নারী মুক্তিযোদ্ধা নুরজাহান বেগম কাকনকে নিয়ে লেখা শেষ, একদিন আবার দেখা তাঁর সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ অধ্যায় জানার পর শ্রদ্ধা-ভক্তি আগের চেয়ে সঙ্গত কারণে বেড়ে গেছে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে হেঁটে ফিরছিলেন আমাবাড়ির পথে। আমি রিকশায় করে মুহাম্মদপুর বাসায় ফিরছি। মনে হয় বাবনগাঁওয়ের নিকট তাঁকে দেখি, ডাক দেই। কিন্তু শুনছিলেন না তিনি। এরমধ্যে একজন পথচারী ‘ও বিবি ডাকইন গো…’ বলে হাঁক দেন। এই একটি হাঁকেই আমি স্মৃতিতাড়িত। এবার আমিও তাঁকে ‘বিবি’ বলে সম্মোধন করলাম। কাকন বিবি!
বাসায় ফিরে রাতে লেখার টেবিলে বসলাম। মনে পড়ে গেল, রংপুরের তারামন বিবির কথা। সিদ্ধান্ত নিলাম, পথ থেকে পাওয়া ‘বিবি’ নামে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেব। সহকর্মী সাংবাদিকদের জানালাম। সবাই একমত। নূরজাহান নামখানি উহ্য রেখে কাকন বিবি ফোকাস করলাম। তাঁকে নিয়ে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ হয় সংবাদ ও একতায়। তাই কাকন বিবি-উন্মিলনের পুরোটা পিংকুদার ঝুলিতে গিয়ে পড়ে। বিশেষভাবে সম্মোহিত হন পিংকুদা-ও। সংবাদ কর্তৃপক্ষ পিংকুদা সংবর্ধিত করেছিল। তাঁকে নিয়ে তাঁর পত্রিকায় আলাদা একটি ফিচারও প্রকাশ হয়েছিল। সংবাদকর্মীরা খবরের শিরোনাম হন শুধু আক্রান্ত হলে। পিংকুদা বিরল।

বীর প্রতীক একটি খেতাব। সরকারি গেজেটভুক্তির বাইরে কাউকে বলা যায় না। কাকন বিবি খেতাবপ্রাপ্ত বীর প্রতীক নন। তবে সম্মোহিত হতেন, বীরত্ব অর্থে। আমার ধারণা, সেই সময়ে তারামন বিবির প্রাবল্যে কাকন বিবির পালায় এ ভুলটি অনেকেই করে ফেলেন। মানবিকতায় হয়তো আর শোধরানো হয় না। তবে সাময়িক সনদে হাতে লেখা বীর প্রতীক উল্লেখিত যে হয়েছে, তার মৌখিক ব্যাখ্যাটাও জানার মধ্যে আছে। ওই সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যে টুকু জেনেছি, তা হচ্ছে সংবর্ধনায় কাকন বিবির কাহিনি জেনে প্রধানমন্ত্রী আপ্লুত হয়ে বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘এই হচ্ছে বীর নারী, আমাদের বীর প্রতীক!’

বীর নারী কাকন বিবি। যৌবনে, যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়ের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন শেষ জীবনে। জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে ছাড়াও তাঁর শতবর্ষী জীবন এতই পূর্ণতা ভরা যে, প্রতিরোধের মার্চ মাসেই পাড়ি দিলেন সহস্রযোজনের পথে। ভালো থেকো বিবি।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর