জাতীয়, লিড নিউজ



দেশদর্পণ ডেস্ক

13 January 2021, 12:49 AM




করোনা প্রতিরোধী স্প্রে আবিষ্কারের দাবি বাংলাদেশি গবেষকদের

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম নাক ও মুখের স্প্রে তৈরির দাবি করেছেন বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টসের (বিআরআইসিএম) একদল গবেষক। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বঙ্গোসেইফ ওরো নেইজল স্প্রে।’ দেশে ২০০ রোগীর ওপর ইতোমধ্যে এই স্প্রে পরীক্ষা করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।

তাদের দাবি, এই ওষুধ নাক ও মুখে স্প্রে হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। আর এ স্প্রে নাসারন্ধ্র, মুখ গহ্বর এবং শ্বাস ও খাদ্যনালীর মিলনস্থলে অবস্থান করা করোনাভাইরাস ধ্বংস করতে সক্ষম।

বঙ্গোসেইফ কোভিড-১৯ রোগীদের ‘ভাইরাল লোড কমিয়ে মৃত্যু ঝুঁকি হ্রাস’ করার পাশাপাশি ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন নিয়ন্ত্রণে’ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও দাবি বিআরআইসিেমের গবেষকদের।

মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রথমবারের মতো বিষয়টি সামনে আনে বিআরআইসিএম।

বৈঠকে বিআরআইসিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ জন কোভিড-১৯ রোগীর ওপর এই স্প্রের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে তা ‘নিরাপদ ও কার্যকর’ প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিআরআইসিএমের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মালা খান গণমাধ্যমকে বলেন, করোনাভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য আমরা এখন যতকিছুই করছি, তার সবই প্রিভেন্টিভ (প্রতিরোধমূলক)। মাস্ক পরছি, বা যাই করছি না কেন। আমরা এখন পর্যন্ত যা জানি, তা হলো- এই ভাইরাসটা আক্রমণ করে মুখ, চোখ ও নাকের মাধ্যমে। সেখানে ভাইরাস কিছুকাল অবস্থান করে। আমরা যে সলিউশন তৈরি করেছি, সেটা যদি কেউ ৩-৪ ঘণ্টা পর পর স্প্রে করে, তাহলে নাক, নাসিকারন্ধ্র, মুখ গহ্বর এবং শ্বাস ও খাদ্যনালীর মিলনস্থলে (ওরোফেরিংস) অবস্থান করা করোনাভাইরাস ধ্বংস করে দেবে।

তিনি বলেন, এতে দুটো সুবিধা হবে। এক, কেউ যদি সংক্রমিত ব্যক্তির কাছাকাছি যান এবং সংক্রমণ ঘটে, তাহলে এই স্প্রে ভাইরাস ধ্বংস করবে। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি ব্যবহার করেন, তার ভাইরাল লোড (ভাইরাসের পরিমাণ) কমে যাবে।

বিআরআইসিএমই প্রথম এ কাজে সফল হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, সারা পৃথিবীতে আমরাই মানবদেহে এই সলিউশন পরীক্ষা করেছি। আমাদের পরে ফ্রান্স একটা করেছে, কিন্তু সেটার স্যাম্পল সাইজ মাত্র ৫ জন।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর এক বছরের বেশি সময় পর প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর এখন তার প্রতিষেধক টিকা বা ভ্যাকসিনের হাত ধরেই মূলত করোনামুক্তির আশা দেখছে বিশ্ব। যদিও এখনও পর্যন্ত অনুমোদিত টিকাগুলো কতদিন মানবদেহে কার্যকর থাকবে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ইতোমধ্যে বেশ কিছু দেশে টিকা প্রয়োগ শুরুও হয়েছে। বাংলাদেশও এ মাসেই টিকা পেয়ে যাবে বলে জানানো হচ্ছে সরকারের ওপর মহল থেকে।

করোনা মহামারির শুরু থেকে বিশ্বের সব দেশ ও অঞ্চলের করোনা সংক্রমণের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ করছে ওয়ার্ল্ডোমিটারস নামের একটি ওয়েবসাইট। মঙ্গলবার রাত ৯টা পর্যন্ত তাদের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭৮১ জন।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মঙ্গলবার সর্বশেষ যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। এ নিয়ে দেশে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭ হাজার ৮১৯ জনে। নতুন করে ৭১৮ জনের শরীরে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ লাখ ২৪ হাজার ২০ জনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে।

আগের দিন ২২ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল অধিদপ্তর।

টিকার মাঠেও আছে বাংলাদেশ
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসকে ঠেকাতে এখনও পর্যন্ত যেসব দেশ টিকা তৈরির দৌড়ে নেমেছে তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নামও। বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড ‘বঙ্গভ্যাক্স’ নামে একটি টিকা তৈরির দাবি করে আসছে। ইতোমধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য টিকা তৈরির অনুমোদনও পেয়েছে তারা।

গত বছরের ২ জুলাই করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের দাবি করেছিল গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তারাই টিকা তৈরির কথা জানিয়েছে। গত বছরের ১৮ অক্টোবর গ্লোব বায়োটেকের গবেষণা ও উন্নয়ন শাখার প্রধান আসিফ মাহমুদ জানিয়েছিলেন, প্রাণীর ওপর তাদের টিকার সফল পরীক্ষা হয়েছে। তারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওই সময় গ্লোব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তারা তিনটি টিকা উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো ডি৬১৪ ভেরিয়েন্ট এমআরএনএ, ডিএনএ প্লাজমিড ও এডিনোভাইরাস টাইপ-৫ ভেক্টর।

বিশ্বের এগিয়ে থাকা টিকাগুলোর মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন করছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে টিকা কিনছে বাংলাদেশ সরকার। এই টিকা সরবরাহ করবে বেক্সিমকো ফার্মা। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বেক্সিমকো ফার্মা ও সেরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে চুক্তি হয়েছে।

হার্ড ইমিউনিটি এখনও অনেক দূরে: ডব্লিউএইচও
মহামারি আকারে করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল বেশিরভাগ মানুষের দেহে এই ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে ওঠা বা হার্ড ইমিউনিটির প্রসঙ্গটি। বিশ্বে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯ কোটি ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬২ জন প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে হার্ড ইউমিটির পথে কতটা এগোলো বিশ্ব? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন অসম্ভব।

ডব্লিউএইচওর শীর্ষ বিজ্ঞানী ড. সৌম্য স্বামীনাথন বলছেন, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, ইসরায়েল, নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও, এই রোগের সংক্রমণ রোধ করতে আরও কতদিন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে- তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সংক্রমণ ঠেকাতে যদিও বিভিন্ন দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এর মধ্যে দিয়ে চলতি বছরই ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মধ্যে এ রোগের প্রতিরোধী ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠবে। কিছু এলাকায় বা দেশের মানুষদের মধ্যে প্রতিরোধী ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে উঠলেও যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের প্রসঙ্গে বলতে হয়, সেক্ষেত্রে আমরা বলব হার্ড ইমিউনিটি অর্জন এখনো অনেক দূরের ব্যাপার।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে ‘কোভ্যাক্স’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক টিকা, অর্থ ও আনুষাঙ্গিক অন্যান্য সহযোগিতার অভাবে এই প্রকল্প কতখানি সফল হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর