এক্সক্লুসিভ



দেশদর্পণ ডেস্ক

৩০ নভেম্বর ২০১৭, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ




একজন আনিসুল হক ও তাঁর বর্ণময় জীবন

দেশদর্পণ ডেস্ক :: নন্দিত টিভি ব্যক্তিত্ব, সফল ব্যবসায়ী নেতা, সর্বশেষ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন আনিসুল হক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জয়ী এই মানুষটি মৃত্যু নামের অমোঘ সত্যের কাছে পরাজিত হয়ে বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) লন্ডন সময় ৪টা ২৩ মিনিটে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

গত ২৯ জুলাই নাতির জন্ম উপলক্ষে সপরিবারে লন্ডনে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আনিসুল হক। অসুস্থ বোধ করায় লন্ডনের একটি হাসপাতালে গেলে সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা চলার মধ্যেই সংজ্ঞা হারান তিনি। পরে চিকিৎসকরা তার মস্তিস্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত সেরিব্রাল ভাসকুলাইটিস শনাক্ত করেন। অবস্থার উন্নতি ঘটলে ৩১ অক্টোবর তাকে আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশনে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকে।

একজন সফল উদ্যোক্তা, সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ এবং টেলিভিশন উপস্থাপক ছিলেন আনিসুল হক। ৮০ থেকে ৯০র দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
আনিসুল হকের জন্ম ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫২, চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালি জেলায়। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

১৯৮৬ সালে তিনি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদী গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই গ্রুপের শুধুমাত্র তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেই প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। তৈরি পোশাক রপ্তানি ছাড়াও এই গ্রুপের রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, দুটি আইটি কোম্পানি, একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং একটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি যা বিভিন্ন বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল দেখিয়ে থাকে। এই গ্রুপের একটি টেলিভিশন চ্যানেল নির্মাণাধীন আছে যা অচিরেই ‘নাগরিক টেলিভিশন’ নামে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

আনিসুল হক শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনসমূহে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। বিজিএমইএ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সংগঠন, যা ৩৫০০ তৈরি পোশাক কারখানা ও প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ করে থাকে। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০% হয় তৈরি পোশাক খাত থেকে। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিনা শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইউরোপে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের জন্য সেসময় তিনি জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) গঠিত হয়েছে দেশের ২৭৬টি অ্যাসোসিয়েশন ও ৮৪টি চেম্বার অব কমার্স নিয়ে। বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে এফবিসিসিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত।

বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের চেম্বার অব কমার্সের সমন্বয়ে গঠিত সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কাজ সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ গতিশীল রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানুষে মানুষে মেলবন্ধন সৃষ্টি। ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এই সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আনিসুল হক।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন ২০১৫ সালের এপ্রিলে। নিজের নির্বাচনী ইশতেহারে রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ‘স্মার্ট’ নগরী হিসাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রচারের শুরু থেকেই তিনি বলতেন, ঢাকার সমস্যা চিহ্নিত, এখন সমাধান করতে হবে। সেই অনুসারে নির্বাচিত হওয়ার পর শুরু করেন ‘সমাধান যাত্রা’।

ঢাকাকে তার জীর্ণ দশা থেকে তুলে আনতে কাজে নেমে পড়েছিলেন আনিসুল হক। তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের রাস্তা থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে জনগণের পথ জনগণকে ফিরিয়ে দেন। তার আগে মানুষের পক্ষে হেঁটে ওই পথে চলাফেরা করা ছিল দুঃসাধ্য। নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনি হাতে নেন পাঁচ হাজার ডাস্টবিন বসানোর কাজ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণে তাঁর নেতৃত্বে উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। ডিএনসিসির বহু এলাকায় পুরোদমে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজ চালু করেন তিনি। জেট অ্যান্ড সাকার মেশিনের মত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি নগরের পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থায় উন্নতি ঘটান। নগরের আকাশকে দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসি এলাকা থেকে ২২ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করান । তাঁর নির্দেশনায় পথচারীবান্ধব ঢাকা গড়তে ফুটপাত, রাস্তা আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয় নগরের সর্বত্র। পাল্টাতে থাকে নগরের দৃশ্যপট। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকার প্রতিটি হোল্ডিংকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

অতীতে সিটি করপোরেশনে টেন্ডার নিয়ে বিস্তর সমালোচনা ছিল। এখন আর সে অভিযোগ নেই। কারণ এখন সব ই-টেন্ডারের মাধ্যমে হচ্ছে। এখন পেশাদার ঠিকাদাররাই কাজ করছেন। কাজের মানও ভালো হচ্ছে। এসবই ছিল মেয়র আনিসুল হকের অবদান। শ্যামলী থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত রাস্তাকে পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করা ছিল যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম পদক্ষেপ। মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট থেকে বছিলা রোডকে দখলমুক্ত করে সেখানে নতুন প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করান তিনি। ফলে সহজেই এখন বছিলায় যাতায়াত করা যায়।

উত্তরা থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা পর্যন্ত সড়কে ২২টি ইউলুপ তৈরির পরিকল্পনা ছিল মেয়র আনিসুল হকের। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন সবসময়। সবুজ ঢাকা গড়তে নগরের ফুট ওভারব্রিজ সাজিয়েচিলেন দৃষ্টিনন্দন গাছগাছালি দিয়ে। ভ্রাম্যমাণ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য ভ্রাম্যমাণ গাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নেন। গুলশানে ইউনাইটেড টাওয়ারে ‘নগর ভবন’ স্থানান্তর করে সেখান থেকে নগরবাসীকে সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা দিচ্ছিলেন তিনি।

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের দ্বিতীয় বছরের মধ্যে নগরের প্রায় সবখানে ডাস্টবিন ও সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণকাজ শেষ করে ফেলেন মেয়র আনিসুল হক। ডিএনসিসি ও নগরবসাঈর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে তিনি চালু করেন স্মার্ট ফোন অ্যাপ ‘নগর’। উচ্ছেদ করেন স্বাধীনতাবিরোধী মোনায়েম খানের অবৈধ বাড়ি। তাঁর নেতৃত্বে সরকারি জায়গা ও সড়ক দখলমুক্ত করার অভিযান ছিল সবসময় চলমান। বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রশস্ত করান তিনি। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছে বিশ্বমানের শৌচাগার। নগরের স্পর্শকাতর স্থানের নিরাপত্তা বাড়াতে নিবন্ধিত রিকশা ও বাস সার্ভিস চালু করা তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। রাতের ঢাকাকে নিরাপদ করতে তিনি স্থাপন করিয়েছিলেন ১৮ হাজার ৬৮৭টি এলইডি বাতি। সড়কসহ নগরের বিভিন্ন স্থানে অজস্র গাছ লাগিয়েছিলেন, যা ঢাকাকে করেছে আরও সবুজ, আরও প্রাণবায়ুময়। বিশ্বে অন্যান্য নগরের সঙ্গে ঢাকার বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করে গেছেন নিরলস।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রসমূহের মালিকদের সংস্থা) প্রেসিডেন্ট ছিলেন আনিসুল হক। শুধুমাত্র একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই নন, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সেরাদের অন্যতম। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থাপনা ছিল পরবর্তী টিভি তারকাদের জন্য অনুকরণীয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনও করেছিলেন তিনি। তবে পরে টেলিভিশনের পর্দায় মানুষ তাকে বেশি দেখেছিল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই।
মোহাম্মদী গ্রুপে ও ব্যক্তিজীবনে আনিসুল হকের পথ চলার সাথী ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুবানা হক। রুবানা হক গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এত বড় দায়িত্বের পাশাপাশি দেশের লেখক সমাজেও তাঁর সরব উপস্থিতি। দেশের সুপরিচিত দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য ডেইলি স্টারে’ নিয়মিত নিবন্ধ লেখেন তিনি। তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একজন প্রদায়কও। সার্ক লিটারারি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক তিনি। ২০০৯ সালে তিনি সার্ক সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। বর্তমান বিশ্বে নারীদের অবস্থান কোথায় এবং আগামী দিনের জন্য তাদের লক্ষ্য কী- এই বিষয়ে আলোচনা করতে বিবিসির নির্বাচিত সারা পৃথিবীর একশ নারীর অন্যতম তিনি।

আনিসুল হক ও রুবানা হকের তিন সন্তান। তাঁদের বড় সন্তান নাভিদুল হক বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের ডিরেক্টর এবং দেশ এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বোস্টনের বেন্টলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় ডিগ্রি অর্জন করেছেন। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করছেন তাঁদের আরেক সন্তান ওয়ামিক উমাইরা। আর বোস্টনের সিমনস কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে সম্প্রতি স্নাতক সম্পন্ন করেছেন তাঁদের আরেক সন্তান তানিশা হক।

প্রায় দুই দশক ধরে দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য অঙ্গনে অবদান রেখেছেন আনিসুল হক ও তাঁর পরিবার। বাণিজ্য, রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে তাঁরা সম্মানিত ও অনুকরণীয়।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর