মতামত



দেশদর্পণ ডেস্ক

২২ মার্চ ২০১৮, ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ




একজন অপরাজিতার দ্রোহ

সাবিনা শারমিন
ইউ এস বাংলার ফ্লাইট ২১১ এর দুর্ঘটনা প্রতিটি মুহূর্তেই আমার চিন্তার ৯৯ শতাংশ দখল করে আছে। কিছুতেই এই চিন্তা থেকে বের হতে পারছিনা । শিশু প্রিয়ন্ময়ীর মুখ, ক্যাপ্টেন আবিদের স্ত্রী আর কেবিন ক্রু নাবিলার কফিনের পাশে এসে সেই হৃদয় বিদীর্ণ করা প্রশ্ন ‘মা ব্যাথা পেয়েছো’? আহ! কি নির্মম করুণ পরিণতি!! মেনে নিতে দম বন্ধ হয়ে আসে।

এই দুঃসহ করুণ মুহূর্তে অনলাইন জুড়ে ভাসছে এক ‘পাকা দাড়িওয়ালা অদ্ভুত ধরণের নোংরা চেহারা এবং নোংরা মানসিকতার শিল্পী সত্ত্বা দাবী করা এক অভিনয় শিল্পীর স্ক্রীনশট কেলেংকারীর কথা। (আমি দুঃখিত কারো শারীরিক অবয়ব নিয়ে কথা বলার জন্য। যা কখনোই আমার স্বভাব নয়। তবে রাকায়েত সাহেবের ক্ষেত্রে আমাকে সেই কাজটিই বাধ্য হয়ে করতে হলো)। ফেইসবুকে একজন নারীর সাথে এই লোকটির কথোপকথন দেখে খুব অস্বস্তি লাগছে! অনলাইনে এসব ইতর দেখতে দেখতে এখন আর একেবারেই এসব নেয়া যায়না। খুব ক্লান্ত লাগে। আজকাল ফেইসবুক পেয়ে বয়স্ক অনধিকার চর্চা করা লোকগুলো কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ! আগে সিনেমা নাটকে গ্রামের বয়স্ক মোড়ল দাদা মার্কা লোকগুলো কিশোরীদের বিয়ে করার জন্য যেমন খ্যাপা হয়ে উঠতো ঠিক তেমন আর কি।

আমি মেয়েটির ক্ষেত্রে ভিক্টিম শব্দটি ব্যবহার করতে পারছিনা । কারণ এই শব্দটি তাঁর ক্ষেত্রে কেমন যেন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। কিন্তু সে তা নয় । সে আমাদের কাছে অপরাজিতা। অন্যায়ের কাছে অপরাজেয়। রুচিশীল তেজী এবং দ্রোহী । ঠিক যেনো নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো।

মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে ক্লান্ত শরীরে দু’টি লাইন লিখতে হচ্ছে। অন্যথায় এ প্রতিবাদে সামিল হওয়া যায়না। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কন্যা শিশুদের জন্য লড়াইয়ে আমারো দু’টি লাইন লেখায় অবদান রয়েছে।

অনেক নারীরাই ভাবেন এসব স্ক্রীনশট প্রকাশ করলে সম্মান নষ্ট হবে। তাই চেপে যাওয়াটিই উত্তম। আর দুষ্টু পুরুষরাও বুঝে নিয়েছে এসকল এবিউসিভ কথা সকল নারীই গোপন করে যাবেন। কাজী রাকায়েত এর মতো এমন ‘ছুপা ধর্ষক’ অনেকটাই সিনেমার নায়িকা ধর্ষণের ভিলেনের মতো চরিত্র। এই লোকগুলো এখন রাতে মেয়েদের দেখলেই বলতে শুরু করবেন ।

তিনি- ‘হাই , হ্যালো, কি করছেন?’
নারী- ‘কি ব্যাপার এতো রাতে নক করলেন যে’?
নারী -‘সময় চেক করে নক করা উচিৎ ছিলোনা’?
তিনি- ‘দেখলাম আপনি রাতে অনলাইনে তাই নক করলাম’।
নারী -রাতে অনলাইনে থাকা মানেই কি আমি এখন আপনার সঙ্গে গল্প করার জন্য ফ্রি আছি এটা মিন করে?’ বা ‘আপনিই সে লোক যার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম’?
তিনি-‘আপনিও কিন্তু রাতে অনলাইনে।
নারী -‘আমি রাতে অনলাইনে সেটা বলার আপনি কে? আপনি কি অনলাইনের মোড়ল ?’
তিনি- না ঘুম আসছিলোনা’
নারী- ‘ওহ! তাই? তাহলে কি গান ধরতে হবে ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ী এসো? আপনার এহেন অনধিকার চর্চার কারণে আপনাকে ব্লক করা হলো।’

-এই কথোপকথনগুলো ছিলো প্রায় এক বছর আগে একজন সিনিয়র সাংবাদিকের সাথে। লোকটি বেশ পরিচিত সাংবাদিক । কিন্তু তিনি কোনরকম অনধিকার চর্চা ও সীমা লঙ্ঘন করেছেন। যার জন্য আমি তাকে ব্লক করতে বাধ্য হয়েছি ।

আসলে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে। আর নারী হলেতো কথাই নেই । সকল পুরুষই যেনো সকল নারীর হাড়ির খবর নেয়ার অধিকার রাখে!

অনেককেই দেখলাম সেলিব্রেটিদের নোংরা গুপ্ত প্রবণতাকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছেন। এটি ভীষণ অন্যায়। আপনারা তাদের গুণের প্রশংসা করুন । অভিনয়ের গুণগান করুন, কিন্তু অন্যায় করলে তাকে দয়া করে মিস গাইড করবেনা না । তাকে তার অন্যায় বুঝতে দিন । কারোক্ষেত্রেই এমন কথা বলা ঠিক নয় যে তিনি এমন কাজ করতেই পারেন না। যারা এমন কথা বলে থাকেন তাদের বলছি, এসকল বিষয়ে কেউ কারো বাইরের দরবেশ চেহারা দেখে ভেতরের প্রবণতার নিশ্চয়তা কিভাবে দিচ্ছেন ?
অনেকেই ভেবে নেবেন এতো রাতে কেনইবা কথা বলতে গেলেন? এড়িয়ে গেলেই হতো ! কই আমাকে তো কেউ এমন কথা বলার সাহস পায় না! আর ও পর্যন্ত গেলোই বা কেনো যে একথা শুনতে হলো? আমি হলেতো এর আগেই কথা বলা বন্ধ করে দিতাম ! আবার অনেক নারীও এমন কথা বলবেন ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি স্বসম্মানে আছি। আমার সাথে কেউ কখনো এমন করার সাহস পায়নি। যে যেমন, তার সাথে তেমন আচরণই করে অনেক পুরুষ । যারা এ ধরণের কথা বলেন তারা নির্দ্বিধায় নিঃসন্দেহে সনাতনী কল্পিত অপশক্তির দাস। (পুরুষতন্ত্র শব্দটি বলতে বলতে ক্লান্ত)
এদের বলতে চাই ‘দেখুন যেকোন একটি অধিকার আদায় করতে অথবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে সবচেয়ে আগে যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হয়, সেটি হচ্ছে কমিউনিটি ফিলিংস। আর সামগ্রিক স্বার্থের বিবেচনাবোধ। যাদের সামগ্রিক স্বার্থের বিবেচনাবোধটি ধারালো নয়, তারা বিরোধিতা না করে চুপ করে থাকাই ভালো।’
আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা এই অসাধারণ সাহসী মেয়েটির এই লড়াই কিন্তু তার একার নয়। এ লড়াই আজ সকল নারীর আত্মমর্যাদার লড়াই ।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর