সোশ্যাল মিডিয়া



দেশদর্পণ ডেস্ক

৬ মার্চ ২০১৮, ৬:৪২ অপরাহ্ণ




এই দুঃখের স্বাক্ষর আমি হৃদয় খুলে কাকে দেখাবো?

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি :: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এতো বেশী আন্দোলন সংগ্রামে জেলে থাকতেন যে শেখ কামাল একবার শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন- হাসুবু, তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকি? এটা জানার পর তখন থেকেই ভাবতাম পৃথিবীতে নিজের মা ছাড়া অন্য কাউকে মা বলে ডাকা যায় নাকি? আমি ডাকতাম, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। তাঁকে আমি ডাকতাম আম্মা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যেমন সকলের আম্মা, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী নামের আমার একজন আম্মা ছিলেন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি জাফর স্যারের দিকে তাকালেন। হাতের ইশারায় কাগজ চাইলেন। কাগজ দেওয়া হলে তিনি তাতে লিখলেন- বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই!

আজকে জাফর ইকবাল স্যার হাসপাতালে চাপাতির কোপ খেয়ে পড়ে আছেন আটত্রিশটি সেলাই গায়ে নিয়ে, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী চলে গেলেন। কিন্তু সত্যিই গেলেন কি?

আমার সাথে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর স্মৃতি খুব মধুর। আমরা দুইজন মিলে সেইদিন গান গাইছিলাম। আম্মা বললেন- তুই কি ওই গানটা পারিস?
-কোনটা?
-আয় আরেকটিবার আয়রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়…
আমি আম্মার সাথে গান গাইলাম। আমার আনন্দ হলো আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সবচেয়ে সম্মানিত বীরাঙ্গনার গলায় গলা রেখে গান গাইছি। আমরা পরস্পর একজন আরেকজনের হাত ধরে রেখেছিলাম। আম্মা যাওয়ার আগে বললেন- তোদের ওপর অনেক দায়িত্ব, মুক্তিযুদ্ধের কথা, আমাদের কথা তো তোরাই লিখবি। আমি তাঁকে বললাম- সামনের বইটা কিন্তু তোমাকে উৎসর্গ করেছি! আসলেই করেছিলাম, বইটার নাম ‘প্রেমিক’। আম্মাকে নিজের হাতে দেবো দেবো করে আর দেওয়া হয়নি।

একদিন আম্মাকে ফোন করেছিলাম, আম্মা বললেন- তোর ‘উনিশ বসন্ত’ বইটা পড়ছি। তুইতো বেশ ভালো লিখিস। কবে আসবি বল? আম্মাকে বললাম- একটু সময় পেলেই আসবো। আর আসা হলোনা। আম্মাকে ফোন করে জানিয়েছিলাম, ‘জারজ’ নামের একটা বই লিখছি, যেখানে তোমাদের মতো বঞ্চিত বীরাঙ্গনাদের কারোর কথা থাকবে। আম্মা বলেছিলেন- লেখ, আমি পড়বো।

‘জারজ’ নামের বইটা আমি লেখার সাহস পেয়েছি, শুধুমাত্র ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী বেঁচে আছেন বলে। তিনি তো আমার পাশে দাঁড়াবেন! বলবেন- প্রীতি যে লাইনগুলি লিখেছে তার প্রতিটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য! আমি সাক্ষী!

সেই সাক্ষ্য দেওয়া মানুষটা এখন নেই, এই দুঃখের স্বাক্ষর আমি আমি হৃদয় খুলে কাকে দেখাবো?

লেখাটি লেখকের ফেসবুক দেয়াল থেকে নেয়া।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর