সোশ্যাল মিডিয়া



দেশদর্পণ ডেস্ক

৪ মার্চ ২০১৮, ৮:০০ অপরাহ্ণ




জাফর ইকবাল স্যারকে আমার চেনা!!!

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম :: বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ক্লাস শেষে বিকাল বেলা হাটছি, এ সময়ে লাইব্রেরী বিল্ডিংয়ের সামনে হ্যান্ডবল গ্রাউন্ডের পাশে দেখি জটলা করে উচু একটা পাকা বিটির উপর ছেলেমেয়েরা গান করছে । সম্মিলিত সুরের উচ্চ শব্দ ।তখনও আমি জাফর ইকবাল স্যারকে বাস্তবে চিনিনা।শুধু নাম শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার আগে অবশ্য বড় ভাইয়ের উৎসাহেই স্যারের নাম শুনেছিলাম। আমার বড় ভাই বলেছিল, ‘শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দে, ঐখানে জাফর ইকবাল স্যার আছেন’ । আসলে ঐ দিনের পর থেকেই জাফর ইকবাল স্যার আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে। স্যারকে আগে কখনো দেখিনি। আমাদেরই একজন বন্ধু জাফর ইকবাল দেখিয়ে বলল দেখ স্যার ছাত্রদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। আমিসহ ঐ বন্ধুটি কাছে গিয়ে দেখলাম কাজী আফজাল আহমেদ কপিল স্যারসহ জাফর ইকবাল স্যার ছাত্রদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। সেদিন আসলে বুঝেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আসলে প্রকৃতপক্ষে কি বুঝায়! ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গোল করে বসে বিকালে গানের আসর এটা কল্পনা করতেই আশ্চর্য লাগতো! এমন দৃশ্য অবশ্য পরেও অনেকবার দেখেছি শিকড় নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের সাথে!

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সুযোগ পেলে স্যারকে পর্যবেক্ষন করতাম। সুদর্শন ব্যক্তিত্ব কিন্তু খানিকটা ছেলেমানুষী! অদ্ভূততূড়ে সাদা চূল ও গোফ। আমি যা জীবনে পছন্দ করতাম না কিন্তু স্যারের ঐ সাদা চুল ও পাকা গোফ দেখতে খুব ভালো লাগতো! পিঠে প্রায়ই একটি লালব্যাগ, কোমড়ে একটি লাল মেশিন ঝুলানো, হাতে হলুদ একটি যন্ত্র।অনেক কিংবদন্তী ঐ লাল ব্যাগ, ঝুলানো মেশিন ও হাতের ঐ যন্ত্র।মাথার উপর প্রায়ই ইয়াসমিন ম্যাডাম ছাতা ধরে থাকতেন! যা সচরাচর দেখা যায়না। ব্যতিক্রম। কোমল ও পবিত্র একটি ভাবমূর্তি ছিল স্যারের। অনেকটা দেবশিশুর মত! দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। স্যারকে নিয়ে গল্পগুলোই স্যারকে মহিমাহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট ছিলো আমাদের জন্য। বেল ল্যাবরেটরী চাকুরী, ক্যালটেট, টাইম ম্যাগাজিনে প্রচ্ছদ, প্যাটেন্ট, চাকুরী ছেড়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন, গনিত অলিম্পিয়াড, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগীতা এসব আরো কত কি!!!

বাস্তবে স্যারের বিভিন্ন বইয়ের মধ্যেও এইসব ছেলেমানুষী গল্প শুনেছি অনেক। মজার ও প্রচন্ড হিউমার সম্পন্ন। বিশেষ করে স্যারের লেখা ‘দেশের বাইরে দেশ’ নামে যে বইটি আমি ২য় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে পড়েছিলাম সেখানে এমন বহু ঘটনা ও গল্প ছিল। আমেরিকান নাপিত কর্তৃক এক চিপ কেটে ফেলে দেয়ার পর আরেক চিপ রেখে দেওয়ার গল্প। যুক্তি হল মানুষের সামনে মানুষ পরলে আসলে একবারে মানুষ একটি চিপই দেখতে পায়!!! রান্না করতে গিয়ে রান্নার বই থেকে পড়া ১”*১” করে মাংস কেটে রান্না করার গল্পগুলোতে অনেক হিউমার ছিল।বেল ল্যাবরেটরী, ক্যালটেট নিয়ে গল্প, আমেরিকান মানুষের বিভিন্ন ধরনের মজার কাহিনীগুলো যেসব হিউমার ছিল তা আজ থেকে ১৫ বছর আগের হলেও আজো ভূলতে পারিনি। মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ আসলে ভূলে গিয়ে যতটুকু মনে রাখতে পারে তাই জ্ঞান’। আসলে একজন লেখকের শক্তি এটাই যে, তার গল্প বলার ভঙ্গিই মানুষকে আগ্রহী ও মনোযোগী পাঠককে রুপান্তরিত করে। জাফর ইকবাল স্যারের শক্তিই ছিল এখানে।

একই কথা খাটে স্যারের অন্যান্য লেখার ক্ষেত্রেও। বিএনপি জামাত ক্ষমতায় থাকাকালে দৈনিক প্রথম আলো’তে সাদাসিদে কলাম লিখেন স্যার।বেশিরভাগ সময়ে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ নিয়ে লিখতেন। সেই সময়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল, উদারনৈতিক শক্তি তো পড়তামই এমনকি শুক্রবার নামাজের পর হলের টিভিরুমে পত্রিকা স্ট্যান্ডে জামাত শিবিরের পোলাপান পর্যন্ত লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন জাফর ইকবাল স্যার তাদের নিয়ে বিশেষ করে গোলাম আজম, রাজাকার আলবদর, আলশামস নিয়ে কি লিখছেন তা পড়ার জন্য! অবশ্য অনেক সময় এমনও হত যে কেউ দেখার আগেই জাফর ইকবাল স্যারের কলাম শিবিরের সাথে যুক্তরা চুরিও করতো! সরিয়ে ফেলার জন্য!

দূর্ণীতিবাজ ভিসি অধ্যাপক ড. মোসলেহউদ্দীনকে নিয়ে লেখা ‘মোহাব্বত আলীর একদিন’ বইটি চমৎকার ছিলো যা আমাদেরকে মুগ্ধ করতো। আমার মনে হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর্ণীতি নিয়ে ঐ সময়ে লেখা বইটি আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত কে হয়তো ছাড়িয়ে যেতে পারেনি কিন্তু অনেক আলোচনা হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

সক্রিয় ছাত্ররাজনীতি করতাম বলে প্রায়ই স্যারের কাছে যেতাম বিভিন্ন প্রোগ্রাম উপলক্ষে। একবার বিজ্ঞানী আলবাট্ আইনস্টাইন এর মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে ‘আইনস্টাইনের বিজ্ঞানের দর্শন ও বর্তমান সংকট’ শীর্ষক একে সেমিনারে স্যারকে অতিথি রাখার জন্য প্রস্তাব দিলে স্যার খুশি হয়ে রাজি হতেন। তিনি এসে সরাসরি দুঃখ করে বলতেন যে, যে কাজ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের করার কথা সেটা তারা করছেনা অথচ তোমরা তরুণদের কাছে বিজ্ঞানের আদর্শ
ও চেতনা তুলে ধরছো। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষানীতি ও ছাত্রঅধিকার বিষয়ে স্যারকে ডাকলে আমাদের প্রোগ্রামে আসতেন। প্রশংসা করতেন, বক্তৃতা দিতেন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো একবার পূর্নগ্রাস সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে আমার সংগঠন থেকে সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষণের ব্যবস্থা হবে কিন্তু আমাদের টেলিস্কোপ নেই । আমরা অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারের কাছে গেলাম সাহায্যের আশা নিয়ে। তিনি আমাদের বড়াবড়ের মতো নিরাশ না করে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ হতে বিশেষ রিকুয়েষ্ট করে টেলিস্কোপ জোগাড় করে প্রোগ্রাম করার ব্যবস্থা করে দিলেন। শুধু তাই নয় মনে আছে সে বিষয়ে আগের দিন রিহার্সেল করলেন এবং এ বিষয়ে একটি বড় বক্তৃতাও দিলেন যে সূর্যগ্রহণ বিষয়ে। এত নিবিড় ভালোবাসা খুব মানুষের কাছেই পেয়েছি।

মাঝে মাঝে স্যারের কাছে যেতাম একটি বামপন্থী পত্রিকা নিয়ে । সঙ্গত কারনেই মনে মনে প্রত্যাশা করতাম স্যার পত্রিকার দাম একটু বেশি দিবেন। স্যার এবং ম্যাডাম আমাদের কখনো নিরাশ করেননি। স্যার হাতে টাকা থাকতোনা বলে স্যার অফিস থেকে দাঁড় নিয়ে দিতেন। ম্যাডাম অবশ্য শুধু বলতেন ‘প্রোগ্রেসিভতো!’ জ্বি বললেই ব্যাগের খুচরো টাকা সব দিয়ে দিতেন।

বিএনপি জামাত ক্ষমতায় থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সংকটে একসাথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি এমন অভিজ্ঞতা কম নয়।২০০৩-০৪ সালের সেই সময়গুলোতে একবার শাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি ক্লাসবর্জন কর্মসূচী নিলে শিবিরের ছেলেরা জবরদস্তি করে তাকে ক্লাসে ফেরত নেয়ার জন্য চাপ দিতে
গিয়ে ‘স্যারের জিহবা কেটে ফেলার হুমকি দেয়!’ মনে আছে ঐ সময়ে আমরা সিএসইর ছাত্রছাত্রীদের কালোব্যাচ কার্যক্রমের সাথে একাত্নতা ঘোষণা করলে শিবির ক্যাডাররা আমাদের লাশ ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদকের ধর্ষণ নিয়ে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন, মোসলেহউদ্দীন ভিসির দূর্ণীতি নিয়ে দূর্ণীতিবিরোধী আন্দোলনে একসাথে কাজ করেছি। ক্যাম্পাসে গুলির ভয়, খুনের ভয়, শিবিরের ভয়, নেতিবাচক প্রচারণা কোন কিছুই স্যারের লেখালেখির শক্তি, নিজস্বতাকে ক্ষুন্ন করতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ নিয়ে লিখতে বিচলিত হননি!

জাফর ইকবাল স্যারের সাথে আমার ও অামাদের সম্পর্ক মননশীল ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গভীরতায়। শুধু ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষুদ্র গন্ডিতে তা সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমি মনে করি বহুমুখীনতা ছিল এই সম্পর্কের ভিত্তি!!

আজ বাংলাদেশে উদারনীতি, প্রগতিশীলতা, দেশপ্রেম মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন উজ্জ্বলকারীদের অন্যতম আলোকবর্তিকা স্যার আক্রান্ত হয়েছেন-সোনার বাংলার মানচিত্র রক্তাত্ব হয়েছে! আমরা স্যারের ছাত্র হিসেবে এটাই প্রত্যাশা করি স্যারের খুনের চেষ্টাকারীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে সোনার বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের খুনের বিচার করতে সরকার উদ্যোগী হবেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সাযেন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল , প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি 

জহিরুল ইসলামের ফেইসবুক থেকে